Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

করোনা ভাইরাসের কারণে আমরা ইদানিং ‘প্যানডেমিক,’ ‘কোয়ারেন্টাইন,’ ‘সোশ্যাল ডিসটেন্স’ এর মত কঠিন কঠিন সব শব্দের সাথে পরিচিত হতে শুরু করেছি। পরিস্থিতি আসলে বেশ কঠিন বলেই মনে হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারে ধ্বস নেমেছে, তেল-স্বর্ণের দর কমছে, অর্ডারের পর অর্ডার ক্যান্সেল হওয়ায় কল-কারখানায় হাহাকার, একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, হোটেল রিজার্ভেশন ক্যান্সেল হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ, মসজিদ মন্দিরে প্রার্থনা বন্ধ, এমনকি হাত মেলানো কিংবা কোলাকুলি করাও বন্ধ। ঘরে বসে পড়াশোনা কিংবা অফিস করার মতো ব্যাপার গুলো ইতোমধ্যেই ঘটতে শুরু করেছে। করোনা ভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাব প্রায় ১৬ থেকে ১৮ মাস ব্যাপী চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর আগামী ১৮ মাস ধরে সবকিছু এভাবেই চলতে থাকলে সারা বিশ্বের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় এবং দৈনন্দিন ব্যাপারে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে বাধ্য তা সহজেই অনুমেয়। কেমন হতে পারে এসব পরিবর্তন?


প্রযুক্তিগত

করোনা ভাইরাসের কারণে মানুষ যখন স্বেচ্ছা গৃহবন্দিত্ব বরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন তখন স্বভাবতই বিভিন্ন ধরনের তথ্যপ্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এতদিন যে সকল অ্যাপস বা ডিজিটাল সুবিধাদির ব্যাপারে তারা উন্নাসিক বা উদাসীন ছিলেন, এখন তারাই সেই সকল প্রযুক্তির ব্যবহার ও উপকারিতা হাতে কলমে দেখার ও জানার সুযোগ পাচ্ছেন। সেই সাথে ক্রমাগত গবেষণার মাধ্যমে করোনা ভাইরাসে প্রতিষধক আবিস্কারের মধ্যদিয়ে বিজ্ঞান আরো একবার তার বিজয় ঘোষণা করবে এবং গবেষক ও স্বাস্থ্যসেবীরা আবারও সেলিব্রেটিতে পরিনত হবেন।

কাছাকাছি আসলেই যেহেতু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে তাই স্কুল কলেজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই সুযোগে ই-লার্নিং এবং ডিসটেন্স লার্নিং সুবিধাগুলো ছাত্র-শিক্ষক সবাই অনুধাবন করতে শুরু করেছেন এবং নিকট ভবিষ্যতে একজন শিক্ষার্থী বাসায় বসেই তার ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গগলস চোখে লাগিয়ে ক্লাস করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে বলে মনে হচ্ছে। আর সেক্ষেত্রে ই-লার্নিং ই সম্ভবত নিকট ভবিষ্যতের অন্যতম শিক্ষা ব্যবস্থা হতে চলেছে। তাই এ খাতে বাড়বে বিনিয়োগ ও কাজের সুযোগ।

গণপরিবহন এবং অফিসে ভিড় এড়াতে ‘রিমোট অফিস কনসেপ্ট’ মেনে নিয়ে ইতোমধ্যে অনেকেই বাসায় বসেই অফিস করছেন; ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মিটিং সেরে নিচ্ছেন। আর এর ফলে অফিস ব্যবস্থাপনায় নতুন নতুন প্রযুক্তির উন্মেষ খুব দ্রুতই ঘটতে যাচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে স্কিল বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই অধুনা চাকুরীজীবীদের হাতে।

টেলিমেডিসিন সেক্টরে যুগান্তকারী পরিবর্তন ইতোমধ্যেই সাধিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে এক্ষেত্রে বিনিয়োগ আরো অনেক বেশি বাড়বে বলে মনে হয়। কেননা আগে চেম্বার ভরা রোগী দেখলেই ডাক্তারদের মন যেমন আনন্দে নেচে উঠতো, এখন আর বিষয়টি তেমন নেই। রোগীরাও এখন যেমন চায় ভিড় এড়াতে তেমনি প্রাণের দায়ে ডাক্তারও চাইছেন রোগী যেন টেলিমেডিসিনের সহায়তায় প্রাথমিকভাবে কোন রোগে ভুগছেন তা নিশ্চিত হয়েই চেম্বারে আসেন।

শ্রমিক নির্ভর কলকারখানায় করোনা ভাইরাসের কারণে যে শ্রমিক সংকট সৃষ্টি হতে যাচ্ছে তা উপশম করতে মালিকরা এখন মানব শ্রমিকের বিকল্প হিসেবে নতুন নতুন রোবট ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই এ আরও আগ্রহী হবেন। একই অবস্থা হতে যাচ্ছে কল সেন্টার ব্যবসার ক্ষেত্রেও। গ্রাহক বা ক্রেতা হিসেবে আমি আপনিও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে মেনে নিতে শুরু করছি যে আমাদের যেকোন অনলাইন জিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে শুরুতে একজন রোবটের সাথেই কথা বলতে হবে। তাই রোবটিক্স এ বিনিয়োগ বাড়বে এবং মানুষের রোবট নির্ভরতা আরো বাড়বে।

রাষ্ট্রীয়

স্বাস্থ্য ঝুঁকি এই মুহূর্তে যেকোনো সরকারেরই টপ প্রায়রিটিতে পরিণত হয়েছে। করোনা ভাইরাসের মহামারী জনগণের কাছে সরকারের স্বাস্থ্যখাত জনিত দুর্বলতা এবং অপ্রতুলতার বিষয়টি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার ফলে রাষ্ট্রের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক গুন বেড়ে গিয়েছে। তাই গণস্বাস্থ্য-বান্ধব সরকারই হতে যাচ্ছে ভোটারদের প্রথম পছন্দ। আর তাই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও স্বাস্থ্য এবং ঔষধ খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এর একটা বড় অংশ ব্যবহার করতে বাধ্য হবে। এর ফলে স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, গবেষণা, ঔষধ শিল্প এবং হাসপাতাল পরিচালনা ব্যবস্থায় গুরুত্ব ও বিনিয়োগ বাড়বে। সেই সাথে এই খাতে অভিজ্ঞ আর পারদর্শীদের চাহিদা বাড়বে বহুগুন।

সহসাই আমরা হয়তো অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে দেখব। করোনা ভাইরাসের কারণে সরকারকে প্রতিনিয়ত জনগণকে আপডেট করতে হচ্ছে। এরফলে পাবলিক সার্ভিস এর প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও বাড়ছে দিনদিন। তাই করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় পাবলিক সার্ভিস সমূহের সক্রিয়তা ও সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করতে হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।
নির্বাচন এবং ভোট ব্যবস্থাপনায়ও আমূল পরিবর্তন আসতে চলেছে। প্রযুক্তির কল্যাণে ভোটাররা এখন ঘরে বসেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আগ্রহী হবেন। তাই নিকট ভবিষ্যতে আমরা হয়তো অনলাইনে লাই্ভ পোলিং এর মাধ্যমেই বিভিন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেখব।

বিশ্ব অর্থনীতি

বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকই ইতোমধ্যে ইন্টারেস্ট রেট এর উপর কাঁচি চালাচ্ছেন। কারণ একদিকে শেয়ার ব্যবসায় বিশ্বব্যাপী ধ্বস নেমেছে, ফ্লাইটের পর ফ্লাইট বাতিল হবার ফলে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ এবং ভ্রমণ এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা ব্যবসায়ও চরম মন্দা চলছে। সহসাই এই মন্দা কাটবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। অন্তত করোনাভাইরাস কার্যকর চিকিৎসা ও প্রতিষেধক আবিষ্কার এর আগ পর্যন্ত তো নয়ই। একই অবস্থা হোটেল ব্যবসায়ও।

চীন সহ সারা বিশ্বেই উৎপাদন থমকে গিয়েছে। মিল-কল-কারখানা সব একে একে বন্ধ হয়ে যাবার ফলে নতুন বিনিয়োগ বা অর্ডার আসাও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর ফলে আসন্ন বৈশ্বিক মন্দার কারনে ব্যাপক কর্মহীনতা সহজেই অনুমেয়। প্রচুর লোক চাকরি হারাতে চলেছে। তেলের দাম কমার পাশাপাশি স্বর্ণের দরপতন ইঙ্গিত করছে যে আমরা এমন আরেকটি বৈশ্বিক মন্দার দিকে এগিয়ে চলেছি যেখানে নতুন কর্মসংস্থান তো দূরে থাক ইতোমধ্যে চাকুরীজীবিদের অনেকেই চাকরি হারাতে যাচ্ছেন। অর্থনীতিবিদরা ইতোমধ্যেই ২০২০ সালের প্রবৃদ্ধি ২.৪ শতাংশের বেশি আশা করতে ভয় পাচ্ছেন; কেউ কেউ একে ১.৫ এর উপর ভাবতেই নারাজ।

এছাড়াও যারা চাকরিজীবী তারা তাদের স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ খাতে মালিকদের কাছ থেকে আরো বেশি প্রত্যাশা করবেন। বিমান ও নৌ বন্দর সমূহ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন বিধ্বস্ত হতে শুরু করেছে। এর ফলে ডোমেস্টিক সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বও বাড়বে। আর সেই সাথে বাড়বে দ্রব্যমূল্য। ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আরও বাড়বে বাড়তে চলেছে। হোয়াইট কলারসদের যারা ঘরে বসেই অফিস করতে সক্ষম আর সন্তানদের অনলাইনে পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে সক্ষম তাদের তুলনায় ব্লু কলার এমপ্লয়ীদের অবস্থা হতে যাচ্ছে শোচনীয়।

সামাজিক

কায়িক ভাবে মেলামেশায় সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি থাকার কারণে যে সামাজিক ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হচ্ছে তা নিরসনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের পদচারণা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে বাড়বে অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসা বাণিজ্য। রেস্টুরেন্টে যেতে না পারার কারণে এবং হোম ডেলিভারি খাবারের উপর আস্থা না আসা পর্যন্ত লোকজন বাসায় রান্না করতেই পছন্দ করবে। এর ফলে অনেকেই নতুন করে রান্নাবান্না শিক্ষার সুযোগ পেলেও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় দুর্দিন বেশ দীর্ঘায়িত হতে চলেছে।

বিশ্বযুদ্ধ সমূহ শেষ হবার পর যেমন যুদ্ধফেরত সৈনিকেরা হয়ে উঠেছিলেন দেশপ্রেমের প্রতীক তেমনি করোনা ভাইরাস মহামরী শেষে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে পরিগনিত হবেন। আবার মহাযুদ্ধের পরপরই হঠাৎ করে তরুণ যুবারা জীবনটাকে উপভোগ করতে উদগ্রীব হয়ে যেমন বিচিত্র সব বিনোদনের উপায় খুজে নিয়েছিল তেমনই করোনাভাইরাস মহামারী শেষেও নতুন নতুন বিনোদনের ট্রেন্ড চালু হতে পারে। তবে বৈশ্বিক মন্দার কারণে দেশে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হবে তার প্রভাব আইন শৃঙ্খলা ও পরিবার ব্যবস্থায়ও পড়বে বলে ধারণা করা যায়। এতে বহুমাত্রিক অপরাধ বৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজে ডিভোর্সের সংখ্যাও বহুগুণ বেড়ে যাবে যা নানাবিধ সামাজিক অনাচার উসকে দেবে।

পরিশেষে, এ কথা সহজেই অনুমেয় যে করোনা ভাইরাস মহামারী কারণে সারাবিশ্বেই যে প্রবল ঝাঁকুনি সৃষ্টি হয়েছে এর ফলে রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আসন্ন। এই পরিবর্তন ঠিক কতটা সহনীয় থাকবে তা নির্ভর করছে বিশ্ব নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রসমূহ এসকল আসন্ন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিজেদের কতটা প্রস্তুত করতে সক্ষম হবেন, তার ওপর।
তাই, আসুন সচেতন হই; প্রস্তুতি নেই এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় টিকে থাকববার।

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

5 thoughts on “করোনা ভাইরাস মহামারীঃ এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার হাতছানি?”

  1. খুব সুন্দর লিখেছেন স্যার। যুগোপযোগী চিন্তাভাবনা❤

    1. Dear Delwar,
      I always aprc and enjoyed your writings.
      No exception this time also. Very good obsn and timely write up.
      May Allah save us from this disaster.
      Convey my salam to your family.
      Regards.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *