Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

কে এই চাণক্য?

সদ্যই উনুন থেকে নামানো ধূমায়িত পায়েসের বাটিটার ঠিক মধ্যখানে কব্জি অবধি ডুবিয়ে দিয়েই বাচ্চা ছেলেটা গরমে আর্তনাদ করে উঠল। ছেলের কা- দেখে বিরক্ত মা তারস্বরে তাকে তিরস্কার শুরু করল, “উজবুক কোথাকার! গরম পায়েসের বাটির মাঝখান থেকে খেতে গেলে তো হাত-মুখ পুড়বেই। কিনারা থেকে ফুঁ দিয়ে জুড়িয়ে নিয়ে খেতে শুরু করতে হয়।”

রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা মায়ের কথাগুলো শুনে কুটিলমতি কৌটিল্য ওরফে চাণক্য ভীষণভাবে চমকে উঠলেন। পাটালিপুত্রের প্রবল পরাক্রান্ত নন্দ রাজবংশকে চিরতরে ধ্বংসের সূত্রটা তিনি অবশেষে পেয়ে গেলেন। তার শিষ্য চন্দ্রগুপ্ত আসলে ঐ ছোট্ট বালকটির মতো সরাসরি মগধ সাম্রাজ্যের রাজধানী পাটালিপুত্র জয়ের চেষ্টা করছেন। স্ট্র্যাটেজিটা আসলে হওয়া উচিত ধননন্দের মূল সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ এড়িয়ে আগে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো দখলে নেওয়া। তাতে শত্রুও ক্রমশ দুর্বল হতে থাকবে আর নিজেদের শক্তিও আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পাবে। তারপর মোক্ষম সময় বুঝে চূড়ান্ত যুদ্ধে নেমে ধননন্দকে হারিয়ে পাটালিপুত্র দখল করে নিতে হবে।

যিশুর জন্মের প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে ভারতবর্ষে দুই পাটি দাঁত সমেত কদাকার এক ছেলে শিশু জন্ম নিল। শিশুটির পিতা ঋষি চানক পেশায় শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ, তিনি তার স্ত্রী চানেস্বরীর সাথে পরামর্শ করে তাদের নবজাতক পুত্রের নাম রাখলেন চাণক্য আর সেই সাথে জন্মের পরপরই তারা নবজাতক চাণক্যের দুধদাঁতগুলো ভেঙে দিলেন। কারণ শাস্ত্র মতে দুই পাটি দাঁত সমেত জন্মানো শিশু মানেই ভবিষ্যৎ রাজা। কিন্তু ব্রাহ্মণের ঘরে এমন শিশুপুত্র জন্মেছে জানলে মগধের রাজার রোষের মুখে পড়তে হবে জেনেই এভাবে তার দাঁত উপড়ে ফেলা। কিন্তু তাতেও কি শেষরক্ষা হলো?

ঘটনাচক্রে কিছুদিনের ভেতরেই ঋষি চানক মগধরাজ ধননন্দের কোপের মুখে পড়ে প্রথমে কারাবরণ করলেন এবং পরে মৃত্যুদ-ে প্রাণ হারালেন। ইতোমধ্যে শিশু চাণক্য ত্রিবেদ মুখস্থ করে তার কৃতিত্বের জাহির দিতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু পিতা চানকের মৃত্যুর পর তার পরিবারের ওপর নেমে আসা দূর্বিষহ বঞ্চনা সইতে না পেরে তিনি দেশ ছাড়লেন। বিদুষী মায়ের পরামর্শে, আর পিতার বন্ধু ও ধননন্দের রাজদরবারের আরেক মন্ত্রী কাত্যায়নের সহায়তায় চাণক্য পৌঁছে গেলেন তখনকার দিনের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় তক্ষশীলায়।

তক্ষশীলায় একদিন পথ চলতে গিয়ে ঘাসের দলায় হোঁচট খেয়ে চাণক্য খাবলা দিয়ে সেই ঘাসের দলা উপড়ে তুলতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন। কারণ ঘাসের দলার গোড়া খুব শক্তভাবে মাটি কামড়ে আঁকড়ে ছিল। তখন তিনি সেই ঘাসের দলার গোড়ায় কিছু মিষ্টির শিরা ছিটিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণের ভেতরই পিঁপড়ার দল এসে মিষ্টির লোভে ঘাসের গোড়ার মাটি আলগা করে ফেলল। এরপর চাণক্য সেই ঘাসের দলাটা মুঠি করে টান দিতেই তা সহজেই উপড়ে উঠে এলো। এমন সব অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে একসময় তিনি তক্ষশীলারই আচার্য নিযুক্ত হন। তক্ষশীলায় অধ্যাপনার সুবাদে ভারতবর্ষের প্রায় সব রাজবংশের যুবরাজদের সাথেই তার পরিচিতি গড়ে উঠল। এমন সময় খ্রি. পূর্ব. ৩২০ সালে মেসিডনের রাজা গ্রিক বীর আলেকজান্ডার তার দিগ্বিজয়ী বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ভারতবর্ষের উপকণ্ঠে শিবির গাড়লেন। ভারতবর্ষে তখন ২৭ জন ছোট-বড় রাজা-মহারাজাদের রাজত্ব, যারা আবার একে অন্যের সাথে বহু কারণে বহুধাবিভক্ত।

“সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!” বলে আলেকজান্ডার যখন মহারাজা পুরুর বিরুদ্ধে লড়াই শুরুর পাঁয়তারা কষছিলেন, চাণক্য তখন আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষীয় রাজাদের বৃহত্তর ঐক্যের জরুরতটা সম্যক টের পেলেন। মগধ ইতোমধ্যে তখন শক্তিশালী ভারতীয় সাম্রাজ্য, যদিও মগধের নন্দরাজ ধননন্দের ধনসম্পদের প্রতি সুতীব্র লোভের কারণে মগধবাসীর প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত প্রায়। অতএব চাণক্য তক্ষশীলা ছেড়ে মগধ রাজধানী পাটালিপুত্রের উদ্দেশে পাড়ি জমালেন। তাছাড়া পিতৃহত্যার প্রতিশোধের হিসাবটাও যে তখনো বাকি রয়ে গেছে।

মগধে পৌঁছেই চাণক্য জানলেন যে ইতোমধ্যে তার মাতৃবিয়োগ ঘটেছে। যাহোক, মগধে চাণক্যের মতো বিদ্বানের কদর ছিল। তাই পাটালিপুত্রে পৌঁছেই তিনি রাজা ধননন্দের ত্রাণ বিতরণ সংঘের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেলেন। কিন্তু নিজের ঠোঁটকাটা স্বভাবের জন্য দ্রুতই রাজার বিরাগভাজন হতেও খুব বেশি সময় নিলেন না। অবশ্য ইতোমধ্যেই চাণক্য নন্দবংশের বিনাশের মোক্ষম অস্ত্র খুঁজে পেয়ে গিয়েছিলেন। সেনাপতি মুরিয়ার পুত্র চন্দ্রগুপ্ত তার সহজাত নেতৃত্বগুণ আর সাহসিকতার কারণে চাণক্যের নজর কেড়েছিল। সেই থেকেই চন্দ্রগুপ্ত তার শিষ্য, যাকে ‘কিং মেকার চাণক্য’ মগধ সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্রাট বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

একদিন নেমন্তন্ন দিয়ে ডেকে এনে খাওয়া শুরু হতেই রাজা ধননন্দ সবার সামনেই চাণক্যকে চরম অপমান করতে লাগলেন। অপমানিত চাণক্য খাবার ফেলে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের টিকির বাঁধন খুলে প্রতিজ্ঞা করলেন নন্দ বংশের বিনাশ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত তিনি তার এই টিকি আর বাঁধবেন না। এরপর তিনি বালক চন্দ্রগুপ্তকে সাথে নিয়ে ফের তক্ষশীলায় পালালেন।

যিশুর জন্মের প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে নেপালের লুম্বিনী নগরে গৌতম বুদ্ধ জন্মেছিলেন। তারও প্রায় ২০০ বছর আগে বর্তমানের বিহারের পাটনা, গয়া আর বাংলার কিছু অংশ নিয়ে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন ভারতের ১৬ মহাজনপদের অন্যতম মগধ সাম্রাজ্য। বৃহদ্রথ রাজবংশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজা মহারথ মগধ শাসন শুরু করেন। এরপর রাজা বিম্বসার গোড়াপত্তন করেন হরিয়াঙ্ক রাজবংশের।

৪১৩ খ্রিস্টপূর্বে হরিয়াঙ্কা রাজবংশের শেষ শাসক নাগাদাসক গণবিদ্রোহে সিংহাসনচ্যুত হন এবং তারই এক মন্ত্রী শিশুনাগ সিংহাসনে আরোহণ করে শিশুনাগ বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা মহানন্দিন ছিলেন এই রাজবংশের শেষ শাসক। মহানন্দিনের রানি সুনন্দার গোপন প্রেমিক ছিলেন রাজপ্রাসাদের মিষ্টভাষী নাপিত মহাপদ্ম। মহাপদ্ম নন্দ পরবর্তীতে ৩৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রানি সুনন্দার সহায়তায় রাজা মহানন্দিন এবং তার পুত্রদের হত্যা করে ভারতবর্ষের প্রথম শূদ্র রাজা হিসেবে নন্দ রাজবংশের সূচনা করেন।

রাজা মহানন্দিনের আরেক উপপত্নী ছিলেন পিপ্লিভানের ক্ষত্রিয় সর্দারের একমাত্র কন্যা মুরা, লোকে তাকে ডাকত মুরাদাসী। চন্দ্রগুপ্তের পিতা মুরিয়া ছিলেন মহানন্দিনের ঔরসজাত মুরাদাসীর একমাত্র সন্তান। উপপত্নীর সন্তান হিসেবে মুরিয়া যথারীতি সিংহাসনের উত্তরাধিকার এবং উপাধি বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু নিজগুণে তিনি নতুন নন্দরাজা মহাপদ্মনন্দের পরম স্নেহভাজন হয়ে উঠলেন, এবং মহাপদ্মনন্দ তাকে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। মহাপদ্মনন্দের এই মুরিয়া প্রীতি যথারীতি তার সৎভাইদের শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াল এবং সৎভাইদের ষড়যন্ত্র থেকে প্রাণে বাঁচতে মুরিয়া বেশিরভাগ সময়ই সপরিবারে রাজপ্রাসাদের বাইরে তার মায়ের মোরা গোত্রীয় স্বজনদের সাথেই কাটাতেন। মহাপদ্মের পর ধননন্দ রাজা হওয়ার পর মুরিয়াকে সেনাপতিত্ব থেকে সরিয়ে দেন। এমনি অবস্থায় একদিন তার পরিচয় হয় আচার্য চাণক্যের সাথে।

৩২৭ খ্রি. পূর্বাব্দে আলেকজান্ডার যখন ভারত জয়ের উদ্দেশে খাইবার পাস হয়ে এগিয়ে আসলেন তখন গান্ধার আর তক্ষশীলার রাজা আম্বিকা সাদরে তাকে বরণ করে নিয়ে নিজ রাজ্য রক্ষা করলেন আর তার আজন্মশত্রু প্রতিবেশী পৌরব রাজ্যের রাজা পুরুর বিরুদ্ধে আলেকজান্ডারের সাথে হাত মেলালেন। ৩২৬ খ্রি. পূর্বাব্দে হিদেস্পেসের যুদ্ধে পুরু যখন আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে লড়ছেন চাণক্য তখন তক্ষশীলা ত্যাগ করে মগধের পথ ধরলেন।

কিন্তু মগধরাজ ধননন্দের কাছে অপমানিত হয়ে চাণক্য চন্দ্রগুপ্তকে নিয়ে তক্ষশীলায় ফিরে আসেন এবং চন্দ্রগুপ্তকে আলেকজান্ডারের শিবিরে পাঠান। তক্ষশীলায় থাকাকালেই রাজা আম্বিকার বোন সুমোহা চন্দ্রগুপ্তের প্রেমে পড়েন। চন্দ্রগুপ্তের এই প্রণয়ের কথা জেনে মগধরাজ হিরণ্যগুপ্ত যুবক চন্দ্রগুপ্তকে হেনস্থা করতে সুমোহার পাণি প্রার্থনা করেন। মগধ তখন শক্তিশালী সাম্রাজ্য, খোদ আলেকজান্ডার মগধকে ঘাঁটাতে সাহস করেননি, আর গান্ধার রাজ আম্বিকা তো কোন ছার। অতএব হিরন্যগুপ্ত সুমোহার বিয়ে হয়ে গেল ধুমধামের সাথে; সম্পদের প্রতি অগাধ লালসার কারণে জনগণ হিরণ্যগুপ্তকে ডাকত ‘ধননন্দ!’

প্রেয়সী হারিয়ে ভগ্নমনোরথ চন্দ্রগুপ্ত আলেকজান্ডারের সাথেও বিরোধ বাধিয়ে চাণক্যের আশ্রয়ে ফিরে এলেন। ইতোমধ্যে আলেকজান্ডারও নিজের ঘর সামলাতে ভারত অভিযানের মাঝপথে অভিযান থামিয়ে মেসিডোনের উদ্দেশে যাত্রা করলেন এবং ফেরার পথেই ব্যাবিলনে পৌঁছানোর পর মাত্র ৩৩ বছর বয়সে মারা গেলেন। কিন্তু ইতোমধ্যে গ্রিকদের কাছে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভারতীয় ভূখ-ে তখনো গ্রিক গভর্নররা শাসন করে যাচ্ছিল। এবার চাণক্য তার শিষ্য চন্দ্রগুপ্তকে পরামর্শ দিলেন এই গ্রিক দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নিজ সেনাদল গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিতে; এবং চাণক্য নিজ প্রভাব খাটিয়ে ছোট ছোট রাজ্যের সহায়তায় চন্দ্রগুপ্তের জন্য একটা গেরিলা বাহিনী গড়ে তুললেন।

গ্রিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চন্দ্রগুপ্ত পশ্চিম ভারতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেলেন। এই অভিযানে চাণক্যের কুটিল পরামর্শে আলেকজান্ডার নিয়োজিত ভারতবর্ষে গ্রিক গভর্নর নিকোসার আর ফিলিপকে আততায়ী দ্বারা হত্যা করা হয়, এবং সেলুকাসের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পন্ন করা হয়। ইতোমধ্যে চন্দ্রগুপ্ত ভারতবর্ষের নতুন ঐকের প্রতিভূ হয়ে উঠেছেন। তাই চাণক্য এবার তাকে মগধ জয়ে মন দিতে বললেন।

চাণক্যের পরামর্শে চন্দ্রগুপ্ত প্রথমেই কাশি আর কোশাল রাজ্য দখল করে নিলেন। কিন্তু দুই লাখ পদাতিক, বিশ হাজার রথ আর তিন হাজার হাতি বিশিষ্ট নন্দ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা সহজ কাজ ছিল না। তাই চাণক্য মগধের বিরুদ্ধে লড়তে চন্দ্রগুপ্তের সাথে অন্যান্য শক্তিশালী রাজ্যের মিত্রতা স্থাপনের চেষ্টা শুরু করলেন। সেকালের প্রথা অনুযায়ী কোনো রাজার সাথে মিত্রতা চুক্তি করতে হলে চন্দ্রগুপ্তকে আগে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হতে হবে। আর এমন অভিষেক শুধুমাত্র মিনাক্ষী, সোমনাথ, জগন্নাথ কিংবা পশুপতিনাথ মন্দিরের মতো স্বীকৃত মন্দিরের জ্যেষ্ঠ পুরোহিতরাই করতে পারতেন।

এবার চাণক্য তার পূর্ব পরিচিতির প্রভাব কাজে লাগালেন। নেপালের পশুপতিনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত তক্ষশীলায় তার শিষ্য ছিলেন। অতএব চাণক্যের অনুরোধে তিনি চন্দ্রগুপ্তকে অভিষিক্ত করলেন এবং হিমাভাটের রাজা পর্বতককে রাজি করিয়ে ফেললেন চন্দ্রগুপ্তকে রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার সাথে মিত্রতা স্থাপনে। পর্বতকের সাথে মিত্রতার উদাহরণকে কাজে লাগিয়ে চাণক্য দ্রুতই আরও সাতটি ছোট ছোট রাজ্যের সাথে চন্দ্রগুপ্তের মিত্রতা করিয়ে দিলেন।

যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয়ের পর এবার চন্দ্রগুপ্ত আর তার মিত্ররা মিলে মগধ জয়ের অভিযানে নামলেন। প্রাথমিক পরাজয় কাটিয়ে উঠে চাণক্যের শ্রেয়তর রণকৌশলের মাধ্যমে ৩২১ খ্রিপূর্বাব্দে চন্দ্রগুপ্ত রাজা ধননন্দের সেনাপতি ভদ্রশলাকে পরাজিত করেন এবং ধননন্দকে সবংশে নির্মূল করেন। ধননন্দের সদ্য পরাস্ত প্রধানমন্ত্রী কাত্যায়ন রাক্ষস ছিলেন স্থাপত্যবিদ্যা আর ধাতববিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ। ধননন্দের পরাজয়ের পর সে হিমাভাটের রাজা পর্বতকের দরবারে যোগ দেন এবং চন্দ্রগুপ্ত গুছিয়ে উঠবার আগেই তাকে মগধ আক্রমণে প্ররোচিত করেন। চন্দ্রগুপ্তের মগধ অভিযানের শুরুতেই চাণক্য সুকৌশলে চন্দ্রগুপ্তের গেরিলা বাহিনী থেকে অক্ষত্রিয় যোদ্ধাদের সরিয়ে হিমাভাটের আশেপাশে শিবির করে পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। এবার রাজা পর্বতক মগধ আক্রমণ করতে এগিয়ে আসতেই চানক্যের নির্দেশে সেইসব অক্ষত্রিয় যোদ্ধারা হিমাভাট আক্রমণ করে বসল।

অগত্যা নিজের দেশ রক্ষা করতে পর্বতক মগধ ফেলে হিমাভাটের পথ ধরলেন আর এই ফাঁকে চাণক্য তাকে নতুন করে মিত্রতার প্রস্তাব পাঠালেন। অতএব রাজা পর্বতক মগধ জয়ের আশা চিরতরে বাদ দিয়ে চন্দ্রগুপ্তের সাথে নতুন করে মিত্রতার প্রস্তাব মেনে নিলেন। এবার হতাশ কাত্যয়ান রাক্ষসকে সুকৌশলে হাত করে নিয়ে চাণক্য তাকে চন্দ্রগুপ্তের মুখ্যমন্ত্রীর পদে নিয়োগ দিলেন। চাণক্য অবশেষে আবার তার টিকি বাঁধলেন এবং তার সুযোগ্য মন্ত্রণায় চন্দ্রগুপ্তের মৌর্য সাম্রাজ্য ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। চৌকস প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও পররাষ্ট্র নীতির কারণে মৌর্য সাম্রাজ্য দ্রুতই খ্যাতির শিখরে আরোহণ করল।

সম্রাট চন্দ্রগুপ্তকে যেন বিষ প্রয়োগে হত্যা করা না যায় সেজন্য চাণক্য নাকি চন্দ্রগুপ্তের অজান্তে তাকে প্রতিদিন খাবারের সাথে সামান্য করে বিষ মিশিয়ে দিতেন। একবার চন্দ্রগুপ্তের অজান্তে তার সন্তানসম্ভবা রানি দূর্ধা সম্রাটের জন্য পরিবেশিত খাবারে মুখ দিলেন এবং মৃত্যুমুখে পতিত হলেন। সম্রাটের বংশরক্ষা করতে চাণক্য তখন অস্ত্রেপচারের মাধ্যমে রানির গর্ভের সন্তানকে বের করে নিলেন। ভারতবর্ষের প্রথম ‘সিজারিয়ান বেবি’ এই রাজপুত্রের নাম বিন্দুসর। বিন্দুসর বালেগ হতেই চন্দ্রগুপ্ত তাকে সম্রাট বানিয়ে দিয়ে নিজে জৈনধর্ম গ্রহণ করে রাজকার্যে ইস্তফা দিলেন। চাণক্য যথারীতি তার প্রধানমন্ত্রী পদেই বহাল থাকলেন।

সুবন্ধু ছিলেন বিন্দুসরের রাজসভার আরেক মন্ত্রী যিনি সম্রাটের ওপর চাণক্যের প্রভাব খর্ব করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তার কাছ থেকে বিন্দুসর নিজের মায়ের মৃত্যুর কারণ জানতে পেরে তিনি চাণক্যকে অভিসম্পাত করলেন। মর্মাহত চাণক্য প্রধানমন্ত্রীত্ব বিসর্জন দিয়ে বনবাসে গেলেন এবং বনবাসে থাকা কালে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে ‘অর্থশাস্ত্র’, ‘চাণক্যসূত্র’ এবং ‘চাণক্যনীতি’ নামে তিনটি অমূল্য গ্রত্থ সংকলন করলেন। একসময় সম্রাট বিন্দুসর তার মায়ের মৃত্যুর প্রেক্ষাপট এবং তার জন্মে চাণক্যের ভূমিকার প্রকৃত সত্য জানলেন এবং সুবন্ধুকেই পাঠালেন চাণক্যকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে। সুবন্ধু এই উপলক্ষ্যে এক বিশাল প্রত্যাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন এবং সেই অনুষ্ঠানে আগুন লাগিয়ে দিয়ে চাণক্যের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

মজার বিষয় হলো ভারতে যখন চাণক্য তার ‘অর্থশাস্ত্র’ অনুশীলন ও সংকলন করছিলেন, তখন প্রায় একই সময়ে চীনে সানজু নামের আরেক মাস্টারমাইন্ড তার বিখ্যাত ‘বিংফা’ অথবা ‘দ্য আর্ট অব ওয়্যার’ অনুশীলন ও সংকলন করছিলেন। দুজনের কেউই নিজে রাজা ছিলেন না, তবে দুজনই ছিলেন ‘কিং মেকারস’। দুজনেই তাদের নিজ নিজ গ্রত্থে শাসকদের রাজ্য শাসন পদ্ধতির ওপর বিশদ আলোচনা করেছেন। অবশ্য চাণক্যের চেয়ে সানজু তার গ্রত্থে রণকৌশলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং আলোচনা করেছেন। কিন্তু সানজুর মতোই চাণক্যও রাষ্ট্র পরিচালনায় তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কারণে আজও আধুনিক পাঠক আর বিশ্লেষকদের বিস্মিত করে রেখেছেন।

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

1 thought on “চাণক্য”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *