Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

“…এক ড্রয়িংরুম-বিহারিণী গিয়েছেন বাজারে স্বামীর জন্মদিনের জন্য সওগাত কিনতে। দোকানদার এটা দেখায়, সেটা শোঁকায়, এটা নাড়ে, সেটা কাড়ে, কিন্তু গরবিনী ধনীর (উভয়ার্থে) কিছুই আর মনঃপূত হয় না। সবকিছুই তার স্বামীর ভান্ডারে রয়েছে। শেষটায় দোকানদার নিরাশ হয়ে বললে, ‘তবে একখানা ভালো বই দিলে হয় না?’
গরবিনী নাসিকা কুঞ্চিত করে বললেন, ‘সেও তো ওঁর একখানা রয়েছে।’
যেমন স্ত্রী, তেমনি স্বামী। একখানা বই-ই তাদের পক্ষে যথেষ্ট।…”

ঠিক ধরেছেন; উপরের লেখাটা সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই কেনা’ গল্পের একটা অংশ। বাঙ্গালীর বই কেনা নিয়ে সৈয়দ সাহেবের মত আমার কোন আক্ষেপ নেই; তবে বই নিয়ে আমার আগ্রহ বেশ পুরনো। আর একেকটা বই ঘিরে লেখক-প্রকাশক-পাঠক মিলে যে অসাধারণ একটা রসায়ন; সেটাও বেশ ভাল লাগে।

বই যেমন হরেক রকমের, বই পড়ার কারনও হরেক রকমের। কেউ স্রেফ শখের বশে পড়ে, কেউ পাশ করার জন্য পড়ে, কেউ জানার জন্য পড়ে, কেউ লিখবার জন্য পড়ে, আবার কেউ কেউ পড়েছি বলতে পারার জন্যও পড়ে। আমরা পড়তে ভালবাসি। পড়ার বিকল্প আসলেই নেই, তা সে কাগুজে পাতায়ই হোক কিংবা আলোকিত স্ক্রিনেই হোক। জীবনযাপনের জন্য অনেক কিছুই শিখতে হয়, জানতে হয়। এক্ষেত্রে বই এখনো পর্যন্ত নিঃসন্দেহে অন্যতম মাধ্যম। আবার গল্প উপন্যাস ছড়া কবিতার বই নিছক বিনোদনের উতস। মানুষ সহজাতভাবেই গল্প শুনতে, গল্প জানতে ভালবাসে, ভালবাসে পড়তে পড়তে রোমাঞ্চিত হতে, প্রেমকাতর হতে, শোকাতুর হতে। মানুষ ভালবাসে ছন্দোবদ্ধ অভিব্যক্তিতে জীবনের শাশ্বততার স্বাদ নিতে, ছড়ার অন্ত্যমিল উপভোগ করতে। বই পড়া তাই শুধুই একটা ‘ক্রিয়াপদ’ নয়, বই পড়া আসলে আমাদের মজ্জাগত অভ্যাস।
তাই মানব জিনে প্রোথিত এই অভ্যাসকে শৈল্পিক আর শুদ্ধভাবে লালনের স্বার্থেই বই পড়া উচিত। নয়ত মানব আত্মা অভুক্ত থাকে, খোরাক বঞ্চিত হয়। যে কোন বিষয়ে সঠিক তথ্য আর যৌক্তিক ব্যাখ্যাটা অনুধাবন করতে প্রচুর বই পড়া উচিত। বই পড়া উচিত নিজের উপলব্ধিকে প্রমিত অথবা নিজের মত করে প্রকাশের আর্টটা আত্বস্থ করতেও।


আমার কাছে একেকটা বই হল একেকটা বিষয়ে একেকজন লেখকের নিজস্ব উপলব্ধির অভিব্যক্তি। লেখক-পাঠকের মধ্যে একটা মজার চুক্তি কিংবা মিথস্ক্রিয়া কাজ করে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, একমাত্র বই পড়বার সময়ই পাঠক হিসেবে আমরা কোনো রকম তর্ক-বিতর্ক ছাড়াই একজন লেখকের পুরো বক্তব্য শুনবার মৌন সম্মতি দেই। সব পাঠকই শুরুতে সামনে যা পায় তাই পড়ে। এরপর বেছে বেছে পড়ে। কারন একটা সময়ে এসে বই পড়ার ব্যাপারে প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা জোনর বা পছন্দ তৈরি হয়ে যায়। তবে অনাগ্রহ নিয়ে বই পড়ার মত অত্যাচার আর নাই। কারন অনাগ্রহ নিয়ে বইপড়া অনেকটা পচা সাউন্ড সিস্টেমে গান শোনা কিংবা নোংড়া চশমার ভেতর দিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার মত; ব্যাপারটা তখন আর মোটেই উপভোগ্য থাকেনা বরং অত্যাচারে পরিনত হয়। তাই যার যা পড়তে ভাল্লাগে তার তাই পড়া উচিত। পাঠকের এই স্বাধীনতা অনবদ্য! আর অবশ্যই কাউকে কোনো বই পড়তে পিড়াপীড়ি করা অনুচিত।


ধারনা করা হয় ‘গিল্গামেশের মহাকাব্য’ই সম্ভবত সবচাইতে পুরাতন বই। এটি প্রায় ২১০০ খ্রিস্টপূর্বে রচিত হয়েছে। অবশ্য এই বই সেই অর্থে বই না, মানে উরুকের রাজাকে নিয়ে পাথরের ফলকের উপর খোঁদাই করে লেখা পাঁচটা কবিতা নিয়ে এই তথাকথিত ‘পাথুরে বই’। শুরুতে মানুষ এভাবেই গুহার দেয়ালে লিখত, মানে আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগের কথা বলছি। কিন্তু গুহার দেয়াল লিখন তো সাথে করে নিয়ে যাওয়া যায় না; তাই খ্রীস্টের জন্মের ৩ হাজার বছর আগে কাদামাটির থালায় লিখে তা পুড়িয়ে নেয়া হত (ক্লে ট্যাবলেট)। এর পাঁচশো বছর পর প্যাপিরাসের চল শুরু হল মিশরে। এদিকে প্রায় একই সময়ে চীনে শুরু হল বাঁশের চাটাইয়ে লেখালেখি। এরপর মোমের ট্যাবলেট, পার্চমেন্ট হয়ে ১০৫ সালের দিকে ‘কাগজ’ চলে এল বাজারে। ১৪৪০ সালে গুটেনবার্গ ছাপাখানা আবিস্কার করলেন, এবং প্রথম ছাপা বই হিসেবে ‘গুটেনবার্গ বাইবেল’ প্রকাশিত হল। কিন্তু ১৯৩১ সালে ‘আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর দ্য ব্লাইন্ড’ উদ্যোগে ‘অডিও বুক’ বানানো শুরু হয়ে গেল আর ২০১৮ সাল নাগাদ ৫০ হাজারেরও বেশি ‘অডিও বুক’ বাজারে চলে এলো। ওদিকে ২০০৪ সালে সনি কর্পোরেশন নিয়ে এল ই-বুক রিডার (সনি লিব্রা)! এরপর কী? কেউ জানেনা। বই মানেই আমাদের কাছে সারিসারি ছাপার অক্ষরে ভরা এক তোড়া কাগজ, যা দুই মলাটের নিচে বাধাই করা থাকে। কিন্তু বই এর এই ক্লাসিকাল ডেফিনিশন ঠিক আর কতদিন টিকবে তা অবশ্য একটা মিলিয়ন ডলার কোশ্চেনই বটে!

কিন্তু যারা লেখার তারা লিখবেই, লিখে যাবেই। খোদ লেখকদের চাইতেও অনেক অনেক বেশি জ্ঞানী পাঠক আমি হরহামেশাই দেখি। আসলে পাঠক আর লেখকের মটিভেশনই ভিন্ন। একজন পাঠক পড়েন জানার আগ্রহে, আর লেখক লেখেন জানাবার আগ্রহে। নিজের উপলব্ধিটুকু অন্যের জন্য লিখে প্রকাশের আগ্রহ বা মোটিভেশন কিন্তু সবার মাঝে থাকে না। যাদের থাকে তারা অল্প জ্ঞান, বেশি জ্ঞান, ভুল জ্ঞান, সঠিক জ্ঞান, দরকারী জ্ঞান, অদরকারি জ্ঞান নিয়েও লিখতে বসে যাবেই। অতঃপর কেউ টিকে যাবে, কেউ হারিয়ে গিয়ে লেখক থেকে ফের পাঠক হয়ে যায়!

অবশ্য লেখকরা সবাই সম্ভবত আজন্ম ফ্রি ল্যান্সার! তারা ইচ্ছে হলে লেখেন, ভাব এলে লেখেন; অনেক লেখককেই আবার দেখেছি কেউ কিছু লেখার ফরমায়েশ দিলেই বিপত্তির শুরু; আর লিখতেই পারেন না! তাছাড়া লিখতে তো আর কোন ট্রেড লাইসেন্স লাগেনা; তাই এরা বোধহয় কখনই পেশাদার হবার তাগিদ বোধ করেন না। কিন্তু বই প্রকাশ করতে ট্রেড লাইসেন্স লাগে। তাই পাঠক-লেখক-প্রকাশক চক্রে প্রকাশকই মোস্ট প্রফেশনাল আর ভাইটাল স্টেইক হোল্ডার! কারন উনি বই না ছাপালে পাঠক-লেখক যোগাযোগ বন্ধ। তাই প্রকাশক কখনো মডারেটর, কখনো উঠতি লেখকের মেন্টর। অবশ্য পাঠক-লেখকদের সরব উৎসবে এরা স্মিত হেসে নিরব থাকতেই ভালবাসেন।

তবে শুনেছি প্রকাশকদের মুখোশ পড়া কিছু ছাপাখানাওয়ালাও নাকি আছেন! এদের কাছে বই আর বিয়ের কার্ডে নাকি কোন তফাত নেই। কোন চুক্তিফুক্তির ধারধারেনা, বই ভর্তি হাজারটা বানান ভুলেও নাকি তাদের কোন বিকার নেই, বই বিক্রির দায় তাদের হিসেবে ১৬ আনাই লেখকের; পারলে লেখকের মাথায় বইয়ের খাচি তুলে দিয়ে ফেরি করতে পাঠায়। অথচ বই কয়টা ছাপাল তার হিসেব রাখতে নাকি ভুলে যায়, ভুলে যায় লেখককে সম্মানী দিতেও; এমনকি নতুন মুদ্রনের সময় ব্যাপারটা লেখককে জানাবার লেহাজটা পর্যন্ত নাকি দেখায় না। বাস্তবতা হল সব সেক্টরেই ভাল খারাপ থাকবেই। শেষ পর্যন্ত কিন্ত ভাল প্র‍্যাক্টিসটাই টিকে থাকে।

প্রকাশকের কি বই প্রকাশের সাথে সাথে লেখককে রয়ালিটির টাকা দেয়া উচিত নাকি একটা মুদ্রনের সব বই বিক্রি শেষে দেয়া উচিত? এইসব হাইথট বিতর্ক পেঙ্গুইন কিংবা কলকাতার পেশাদার প্রকাশকদের মুখে মানায়; আমরা সম্ভবত এই সেক্টরে এখনো সেই লেভেলে পৌছাইনি। তবে একথা সত্য যে পাঠক রুচিতে পরিবর্তন আসছে; নতুন প্রজন্ম ছাপা বই এ আগ্রহ হারাচ্ছে কিনা জানিনা, তবে তারা আলোকিত স্ক্রিনেই স্ক্রল করতে করতে পড়তে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ্য একথা অনস্বীকার্য! লেখক লিখবেই, আর পাঠকও পড়বেই, তাই চাপিয়ে দেবার আসলে কোনই সুযোগ নেই। বরং একগাদা বিকল্প বিনোদনের এই যুগে প্রকাশকদেরই উদ্যোগ নিতে হবে; আর নতুন প্রজন্মের পাঠকদের ধরে রাখতে তাদের সুবিধাজনক মাধ্যমেই লেখা প্রকাশের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট থাকা অবস্থায় একদিন আমি জিইসির মোড়ে দামী এক পর্দার দোকানে অলস ঢুঁ মারছিলাম। বিএমএ ক্যাডেট পর্দা কিনবে না, এটা নিশ্চিত জেনেও দোকানি আমাকে আগ্রহ নিয়ে বাহারি পর্দা দেখাচ্ছিল। এক সময় আমি দোকানীকে জিজ্ঞেসই করে ফেললাম যে, আমি পর্দা কিনব না সেটা জেনেও কেন তিনি অযথা আমাকে পর্দা দেখিয়ে নিজের সময় নষ্ট করছেন!দোকানি কিচ্ছু না বলে রহস্যময়ভাবে হেসেছিল, আর আমিও একসময় বেরিয়ে এলাম খালি হাতে।

কয়েকবছর পরের কথা…তখন আমার পোস্টিং চট্টগ্রামে। বউকে নিয়ে বেরিয়েছি বাসার জন্য নতুন পর্দা কিনতে। সোজা গিয়ে হাজির হলাম সেই দোকানে এবং আমার বউ সারা বাসার জন্য চমৎকার এক সেট পর্দা, সাথে ম্যাচ করা কার্পেট, কুশন কাভার আর বেডশীটও কিনে নিয়ে বাসায় ফিরল। জাজেস টু নোট, কবে এই ‘পর্দা বিক্রেতা’ একজন একাকী ক্যাডেটের পেছনে ইনভেস্টে করেছিলেন আর কবে উনি এর লাভ উশুল করলেন! একেই বুঝি গুড বিজনেস স্ট্র‍্যাটেজি আর বিনিয়োগ বলা যায়!
ঢাকার ২১শে ফেব্রুয়ারি বই মেলায় স্বভাবতই ভীষণ ভিড় থাকে। এদের সবাই ক্রেতা নন, এবং অনেকেই যুগল কপোত-কপোতি। অনেকেই বই না কিনে এদের অলস ঘুরাফেরা করা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে থাকেন, কটাক্ষও করেন। অথচ এরাই কিন্তু ভবিষ্যৎ ক্রেতা; এরা অন্যকোথাও না গিয়ে যে বেড়াতে আসার জন্য বইমেলাকেই বেছে নিয়েছে, সেজন্য প্রকাশকদের উচিত তাদের কৃতজ্ঞচিত্তে ধন্যবাদ দেয়া; উচিত এদের জন্য বাড়তি কিছু করা। কারন কাল এরাই স্ত্রী-স্বামী-সন্তান-পরিবারসহ উন্নততর ক্রয়সাধ্য নিয়ে বই কিনতে মেলায় আসবেন।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি যে, এদেশে পাড়ায় পাড়ায় আনাচে কানাচে অসংখ্য ‘বিউটি পার্লার’ এর দেখা মেলে, (যার কোন বাংলা সমার্থক প্রতিশব্দ আমি খুঁজে পাইনি); অথচ সারা দিন ঘুরেও তিন তল্লাটে একটাও বইয়ের দোকানের দেখা মেলে না! আর সেকারনেই বই মেলা আর বই মেলায় যাওয়াটা এখন ফ্যাশন সর্বস্ব ফেব্রুয়ারি মাস নির্ভর কালচার। অথচ বছরব্যাপি সুলভে বই কেনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দেশের প্রত্যেক বাজার আর শপিংমলে অন্তত একটি করে বইয়ের দোকান থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। প্রকাশকদেরই এব্যাপারে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে, কারন তারাই এই বানিজ্যে ‘ইনভেস্টরস’, আর তাই নিজেদের বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তাদেরই তো সোচ্চার হবার কথা আর সবার আগে।

তরুনরাই সব সমাজে স্মার্টনেসের সংজ্ঞা ঠিক করে দেয়। ইদানিং তরুণতরুণীরা বই পড়াটাকেই সত্যিকারের স্মার্টনেস বলে ভাবতে শুরু করেছে। আমাদের তরুন প্রজন্মকে ধন্যবাদ, আমি ওদের জন্য গর্বিত!বই ঘিরে পাঠক-লেখক-প্রকাশকরা চিরসুখী হোক! বই হোক নিত্য সঙ্গী!
হ্যাপি রিডিং…

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *