Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

হযরত নুহ (আঃ) কে পশ্চিমারা ডাকে ‘নোয়াহ’ নামে। তিনি যখন তার বিশাল নৌকা বানানো শুরু করলেন তখন তাকে নিয়ে বিদ্রুপ আর কটাক্ষ করার লোকের অভাব হয়নি। কিন্তু তিনি মোটেই দমে যাননি, এবং তার দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি বন্ধ রাখেননি। মানব সভ্যতার ইতিহাসের ভয়াবহতম বন্যা হয়েছিল তারই সময়ে, এবং তার সেই বিশাল নৌকা বা ‘ নোয়াহ’স আর্ক’ এ চড়েই পৃথিবীর সব প্রানীকুলের বংশ রক্ষা হয়েছিল।

‘ডিজাস্টার’ বা দুর্যোগ দুই কিসিমের, ‘মেন মেড’ আর ‘ন্যাচারাল।’ ভূমিকম্প, দাবানল, ভুমি কিংবা ভবনধ্বসের মত ডিজাস্টার গুলো আচমকাই আসে, কারন আগেভাগে প্রেডিক্ট করা কঠিন। কিন্তু বন্যা সম্ভবত আমাদের নিয়মিত দুর্যোগ। বর্ষা এলেই বন্যা, নদী ভাঙন। পত্রিকার প্রথম পাতা আর টিভি স্ক্রিন জুড়ে বাস্তুভিটা হারাদের করুণ হাহাকার, পেটফোলা নিথর গবাদিপশুর নিরুদ্দেশ ভেসে যাওয়া, আর সাথে ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ এর ফাঁপানো ফুটেজ…

অথচ প্রতিবার বন্যায় সারাটাদেশ কিন্তু একসাথে ডুবে যায় না।
তারমানে বন্যাপ্রবন এলাকা চাইলেই চিহ্নিত করা সম্ভব, এবং সম্ভব সেই এলাকার এডমিনিস্ট্রেশন আর লোকাল লিডারশীপকে বন্যা মোকাবেলায় ট্রেইন করা।
বন্যা মোকাবেলার জন্য দরকারি লজিস্টিক বর্ষার আগেই সেই এলাকাগুলোতে বিল্ড আপ করাও সম্ভব।
বন্যাপ্রবন এলাকায় বন্যার সময় পানি সর্বোচ্চ কোন হাইটে আসে তা রেকর্ড করা সম্ভব, আর ঐসব এলাকার সব রাস্তা আর বিল্ডিংও সেই হাই ওয়াটার মার্ক লেভেলের ওপর বানানো নিশ্চিত করা সম্ভব।
নদীভাংন প্রবন এলাকাও চিহ্নিত করা সম্ভব, আর ভাঙন প্রবন সেই এলাকাগুলো থেকে বসতভিটা অপসারণ করাও যেমন সম্ভব, তেমনি নতুন করে গৃহনির্মাণ বন্ধ করাও সম্ভব।
বর্ষার আগেই বন্যাপ্রবন এলাকায় মজুদ নৌকা আর স্পিড বোট এর ডিটেইল্ড স্টক টেকিং করা সম্ভব। বন্যার্তদের চুলা জ্বালানোর উপায় থাকে না, ড্রাই রেডি ফুডই ভরসা। তাই লোকাল গোডাউনে চাল ডালের পাশাপাশি চিড়া মুড়ির মত ড্রাই ফুড স্টক করাও সম্ভব।
বন্যায় যাদের বাড়িঘর ডুবে যায় তাদের রেস্কিউ করার জন্য রেস্কিউ টিম রেডি রাখা সম্ভব, এবং রেস্কিউ করে আনার পর পানি নামার আগ পর্যন্ত দুর্গতদের সাস্টেন করাবার জন্য পূর্ব পরিকল্পিত টেম্পরারি ফ্লাড ক্যাম্প খোলাও সম্ভব। আবার বোবা গবাদিপশুর জন্যও আলাদা উচু স্থান এয়ারমার্ক করে রাখা সম্ভব।
রেস্কিউ আর রিলিফ টিমের পাশাপাশি বন্যার সুযোগে সাময়িক পরিত্যক্ত বাড়িঘরে লুটপাট ঠেকাতে ‘ফ্লাড সিকিউরিটি টিম’ও রাখা সম্ভব।
বন্যার পরপরই পানিবাহিত রোগের মহামারী লেগে যায়, তাই প্ল্যান করা সম্ভব পোস্ট ফ্লাড ডিজিজ কন্ট্রোলের, আর বন্যা শেষে দ্রুত স্বাভাবিক জীবন শুরু নিশ্চিত করার জন্যও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া সম্ভব।
কিন্তু দু’দশ টাকা ত্রান সাহায্য দেয়া ছাড়া আমরা কি পরিকল্পিত কোন উদ্যোগ নিতে পেরেছি নিজেদের দুর্ভোগ কমাতে? সব অসম্ভব কে সম্ভব করা তো আর জলিল ভাইয়ার একার মাথাব্যথা না, তাইনা?

‘লিটোরাল’ মানে সমুদ্রতীরবর্তী, আর ‘রিভারাইন’ মানে নদীমাতৃক। জন্মাবধি আমরা যতটা রিভারাইন ঠিক ততটাই লিটোরাল। অথচ আমরা নদী অথবা সাগর কোনটারই ফুল এডভান্টেজ নিতে শিখিনি। আবার ঘূর্নিঝড় কিংবা বন্যার মত প্রায় নিয়মিত দুর্যোগের এগেইন্সটে পরিকল্পিত উপায়ে নিজেদের ট্রেইন্ড করতেও পারিনি! আফসোস! ফারাক্কার দেয়াল চুইয়ে বাড়তি এক ফোটা পানি আসেনা শুষ্ক মৌসুমে, অথচ ভরা বর্ষায় ফারাক্কা উপচে মাঝেমধ্যে আস্ত হাতি এসে হাজির হয়; নিয়তির কী নির্মম পরিহাস!

অথচ লাতিন আমেরিকায় পেরুর দুর্গম এক পাহাড়ের চূড়ায় ১৪৫০ সালে ইনকা রাজা পাচাকুটি এক দূর্গ শহর গড়েছিলেন। প্রবল বৃষ্টিতে যেন পাহাড়ের চূড়ায় বানানো এই শহর ধ্বসে না পরে, সেজন্য ইনিকারা নিচ থেকে পাহাড় কেটে ধাপে ধাপে বিস্ময়কর এক পানি নিষ্কাশন পদ্ধতিতে শহর সুরক্ষা নিশ্চিত করেছিল। মডার্ন ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে আজো এই ইনকা শহর ‘মাচুপিচু’ এক বিস্ময়! ‘মাচুপিচু’ বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি হিসেবে নাম লিখিয়ে ফেলেছে, আর আমরা আজো বন্যা নিয়ন্ত্রনের অ-আ-ক-খ শিখে উঠতে পারলাম না! ‘৮৮ এর মত বন্যা যদি সত্যি আসে; আমরা কী প্রস্তুত?

“ভাইয়া, এক্সাম শেষ হয়েছে। আজকে থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হবে। আমরা বন্যার্ত দের জন্য ত্রাণ দিতে যাবো।“
“২৮০০ মানুষকে দুই দিনের খাবার দেয়া হইছে, কালকে আরো ২০০০ মানুষকে দেয়া হবে ইনশাল্লাহ…”
বন্যা এলেই ইনবক্সে অনেকেই এমন মেসেজ দেয়, ছবিও পাঠায়; অনেকেই বেশ প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রান পৌছে দেবার চেস্টা করছে।
ইউ পিপল আর রিয়েল ডুয়ারস! এন্ড ইউ পিপল আর অসাম!! তোমাদের/আপনাদের সবাইকে স্যালুট!!! ত্রান নিয়ে যারা প্রত্যন্ত আর দুর্গম এলাকায় রওয়ানা দিচ্ছেন তাদের জন্য কিছু কুইক টিপসঃ

এক। প্রথমে টার্গেটেড দুর্গত ত্রান এলাকা থেকে দূরে নিরাপদ কোথাও আপনাদের ত্রান সামগ্রী স্টোর করুন।

দুই। ছোট একটা দল পাঠিয়ে টার্গেটেড ত্রান এলাকা রেকি করুন। কোন ঘাটে নামবেন, কোথায় ত্রান দেবেন নাকি নৌকা থেকেই ত্রান দেবেন ইত্যাদি। ত্রান এলাকার লিডারশিপের সাথে কন্টাক্ট এস্টাব্লিশ করুন এবং আপনাদের মিশন সম্পর্কে ব্রিফ করে তাকে আপনাদের রিলিফ অপারেশনের সাথে সম্পৃক্ত করুন। পথ চেনাবার জন্য ত্রান এলাকা থেকে একজন/দুইজন গাইড সিলেক্ট করুন।

তিন। নিকটস্থ থানাকে অবহিত রাখুন যেন যেকোন বিপদে হেল্প চাইতে পারেন।

চার। ত্রান বিতরণের দিন ত্রান সহ রওয়ানা দেবার আগে এডভান্সড একটা পার্টি পাঠিয়ে দিন ত্রান এলাকায় লোকজনদের জড়ো করে রেডি রাখার জন্য।

পাঁচ। সব ত্রান একত্রে এক নৌকায় তুলবেন না। নৌকা উলটে যেতে পারে আবার লুঠও হতে পারে।

ছয়। সাঁতারে এক্সপার্ট হলেও লাইফ জ্যাকেট ইউজ করুন।

আট। ফ্রন্টে শুধুমাত্র এক্সট্রিমলি নেসেসারি আইটেম, ক্যামেরা আর টাকাপয়সা ক্যারি করুন। এসব আলাদা ব্যাগে রেখে পলিথিন ইত্যাদি দিয়ে সিকিউর করুন।

নয়। নিজেদের খাবার, পানি এবং ফার্স্ট এইড আলাদা সিকিউর করুন। নিজেদের রেস্ট নিশ্চিত করতে ডিউটি ভাগ করে নিন।

দশ। সবাই ফ্রন্টে যেতে চায়। কিন্তু সবাই একসাথে ফ্রন্টে গেলে ত হবে না। পেছনে মেইন স্টোর লুক আফটার করার জন্য, নতুন ত্রান এলে তা স্টোর করার জন্য, সামনে বাড়তি ত্রানের চাহিদা থাকলে তা দ্রুত পাঠানোর জন্য, ফরোয়ার্ড টিম বিপদে পড়লে রেস্কিউ করার জন্য ঠান্ডা মাথার বুদ্ধিমান কাউকে পেছনে থাকতেই হয়। তাই এই ডিউটিটা রোটেট করে হলেও এন্সিউর করা জরুরী।
মনে রাখুন, সেফটি ফার্স্ট!

পুনশ্চঃ
এই মুহুর্তে আর কিছু মাথায় আসছে না, মনে পড়লে পরে জানাব, আর অন্যরা তাদের কমেন্টে জানাতে পারেন।
রিলিফ ওয়ার্রকারদের জন্য ভালবাসা…

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *