Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

ইয়ারমুখ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট
(দ্য ইনসেপশন অব দ্য গ্রেটেস্ট ফিয়াট)

খলিফা আবু বকর খেলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন; মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর আরব গোত্রগুলোর ঐক্যে দ্রুত ফাটল ধরল, আর জায়গায় জায়গায় প্রতিদিনই নতুন নতুন সব ভণ্ড নবী-রাসুল দেখা দিতে লাগল। এদের থামাতে আর দমাতে গিয়ে শুরু হলো রিদ্দাহ যুদ্ধ। নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান খালিদ বিন ওয়ালিদ ইয়ামামার যুদ্ধে ভণ্ড নবী মুসাইলিমাহকে পরাস্ত করে মধ্য আরবজুড়ে খেলাফতের কর্তৃত্ব সমুন্নত রাখলেন। এরপর আবু বকর খালিদকে পাঠালেন পার্সিয়ান ফ্রন্টে [১]।

পার্সিয়ান ইনভেশন [২]-এর শেষ দিকে ফিরাজের যুদ্ধে বাইজান্টাইন রোমান, সাসানিদ পার্সিয়ান আর খ্রিষ্টান আরবদের যৌথবাহিনীকে পরাস্ত করে খালিদ যখন কাদিশিয়াহ অভিযানের পথে, তখন তিনি খলিফা আবু বকরের আদেশ পেলেন সিরিয়ান ইনভেশনের কমান্ডার আবু উবায়দাকে রিইনফোর্স [৩]করার। প্যালেস্টাইনের আজনাদাইনে আবু উবায়দার সেনাবাহিনীকে বাইজাইন্টাইনেরা প্রায় ঘিরে ফেলেছিল। সিরিয়ান ইনভেশনের এই সংকটময় মুহূর্তে সিরিয়ান ফ্রন্টে খালিদের অভাব চরমভাবে অনুভূত হতে শুরু করে। তাই প্রথমে চলমান আজনাদাইনের সংকট নিরসন করে এরপর পরবর্তী সিরিয়ান ইনভেশন পরিচালনা করার জন্য খলিফা আবু বকর তখনো পার্সিয়ান ফ্রন্টে যুদ্ধরত খালিদকে সিরিয়ান ফ্রন্টের নতুন সেনাপতি নির্বাচন করেন এবং খালিদকে রিইনফোর্সমেন্টসমেত দ্রুত ইরাক ছেড়ে সিরিয়ায় যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।

নির্দেশ পেয়েই খালিদ তার বাহিনীর কিছু উটকে দুই দিন পর্যন্ত পানি না খাইয়ে রাখার নির্দেশ দিলেন। ইরাক থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথ ছিল দুটো আর সংগত কারণেই সেই দুই পথে বাইজান্টাইন অ্যাম্বুশ [৪] থাকার কথা। তাই খালিদ সিরিয়ান মরুভূমি হয়ে ইরাক থেকে সিরিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। সেনাদল নিয়ে কেউ এই মরুভূমি পাড়ি দেওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারেনি কখনো। কিন্তু খালিদ তো খালিদই! যাত্রা শুরুর আগে খালিদ দুই দিনের তৃষ্ণার্ত উটগুলোকে গলা অবধি পানি খাইয়ে নিলেন। তারপর টানা দুই দিন মার্চ [৫] করে সিরিয়ান মরুভূমি অতিক্রম করলেন। পথে তার সৈন্যদের পানির চাহিদা পূরণ করলেন সেই গলা পর্যন্ত পানি গেলা উট জবাই করে পানি বের করে নিয়ে। [৬]

খালিদ রওনা দিয়েছে শুনেই আবু উবায়দা বসরা নগর আক্রমণের জন্য সুরাবিলকে আদেশ দিলেন। কিন্তু সুরাবিল যখন তার মাত্র চার হাজার সৈন্য নিয়ে বসরা নগরীর উপকণ্ঠে পৌঁছালেন তখন বাইজান্টাইন আর খ্রিষ্টান আরবদের বিশাল যৌথবাহিনী তাকে ঘিরে ফেলল। সুরাবিলের মুসলমান বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত, ঠিক তখনই সিরিয়ান মরুভূমি ফুঁড়ে প্রায় অশরীরী এক বাহিনীর মতো খালিদের মোবাইল গার্ড [৭] যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করল এবং পেছন দিক দিয়ে বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীর ওপর আছড়ে পড়ল। আক্রান্ত হয়ে বাইজান্টাইন যৌথবাহিনী রণে ভঙ্গ দিয়ে বসরা নগরীর ভেতরে পালিয়ে গিয়ে নগরীর প্রধান দরজার খিল এঁটে দিল, আর আবু উবায়দা ছুটে এসে খালিদকে জড়িয়ে ধরে তার হাতে সিরিয়ান ফ্রন্টের কমান্ড তুলে দিল।

৬৩৪ সালের মধ্য জুলাইয়ের ভেতর বসরা নগরীর পতনের মধ্য দিয়ে ঘসানিদ বংশের পরিসমাপ্তি ঘটল আর খালিদ ৩০ জুলাই ৬৩৪ তারিখে আজনাদাইনের যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের পরাজিত করে সিরিয়ার বুকে বাইজান্টাইন রোমান সাম্রাজ্যের পতনঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন।

বাইজান্টাইন রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস এমেসায় বসে আজনাদাইনের ফলাফল জানলেন এবং প্রায় একই সঙ্গে পরবর্তী বাইজান্টাইন শক্ত ঘাঁটি দামেস্ক নগরী থেকে রিইনফোর্সমেন্টের তাগদা পেলেন। হেরাক্লিয়াসের মেয়ের জামাই টমাস ছিলেন তখন দামেস্ক প্রতিরক্ষার দায়িত্বে। খালিদের বাহিনী এগিয়ে আসছে জেনে হেরাক্লিয়াসের কাছে রিইনফোর্সমেন্ট চেয়ে পাঠানোর পাশাপাশি তিনি দামেস্কের ডিফেন্স আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দিলেন। খালিদের অগ্রাভিযানের গতি কমিয়ে দিতে তিনি দুটো সেনাদল সামনে পাঠিয়ে দিলেন, কিন্তু তারা খালিদের ঝোড়োগতির অগ্রাভিযানের সামনে পাত্তাই পেল না। হেরাক্লিয়াসের প্রথম দফা রিইনফোর্সমেন্টটা কোনোমতে দামেস্ক পৌঁছাতে পারলেও ২০ আগস্ট ৬৩৪ তারিখে খালিদ দামেস্ক অবরোধ করে ফেলার পর রিইনফোর্সমেন্টের সব রুট বন্ধ হয়ে গেল। দামেস্ক অবরোধ চলাকালেই খলিফা আবু বকর ইন্তেকাল করলেন আর উমর বিন খাত্তাব খিলাফতের নতুন কর্ণধার নির্বাচিত হলেন।

খলিফা উমর প্রথম সুযোগেই খালিদ বিন ওয়ালিদকে মুসলমান সেনাবাহিনীর কমান্ড থেকে সরিয়ে দিয়ে আবু উবায়দাকে নতুন সেনাপ্রধান ঘোষণা করলেন এবং খালিদকে আবু উবায়দার আন্ডার কমান্ড [৮] করে দিলেন। আবু উবায়দা নিঃসন্দেহে সেনাপ্রধান হওয়ার যোগ্যই ছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সিরিয়ান ফ্রন্ট কমান্ডও করছেন, কিন্তু তিনি নিজেও খুব ভালো করেই জানতেন যে অন্তত যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাপতিত্বে মুসলমান সেনাবাহিনীতে খালিদের সমকক্ষ এই মুহূর্তে আর কেউই নেই। তাই দামেস্ক অবরোধের পুরো সময় খলিফা উমরের এই পয়গাম তিনি গোপন রাখলেন। ১৮ সেপ্টেম্বর ৬৩৪ তারিখে দামেস্কের পতন হলে আবু উবায়দা খলিফা উমরের ইচ্ছার কথা খালিদকে জানালেন এবং নিজে কমান্ড গ্রহণের পরপরই সেনাপ্রধানের ক্ষমতাবলে খালিদকে তার চিফ অব স্টাফ [৯] করে ফেললেন এবং তাকে মুসলমান কাভ্যুলরি রিজার্ভের কমান্ডার ঘোষণা করলেন।

মুতার যুদ্ধে বাইজান্টাইন রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে পরপর নয়টা তরবারি ভাঙা খালিদ ইতিমধ্যে মহানবী (সা.)-এর দেওয়া উপাধি ‘সাইফুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর তরবারি’ নামের সার্থক প্রতিভূ। কোনো যুদ্ধেই হার না মানার রেকর্ডধারী খালিদের যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিতি মানেই এক লাখ সৈনিকের রিইনফোর্সমেন্ট আর আসন্ন বিজয়ের গ্যারান্টি। তাই উমরের এমন সিদ্ধান্ত স্বভাবতই খালিদকে হতভম্ব করে দিল, কিন্তু তিনি তা সামলে নিয়ে বললেন, ‘যদি আবু বকর ইন্তেকাল করে থাকেন আর উমর নতুন খলিফা নির্বাচিত হয়ে থাকেন, তো আমাদের সবারই উচিত খলিফা উমরের প্রতি অনুগত থাকা এবং তার নির্দেশ মেনে চলা।’

যুদ্ধক্ষেত্রের কমান্ডার [১০] হিসেবে আবু উবায়দা ছিলেন অনেক বেশি সাবধানি, তাই খালিদ পাশে থাকার পরও স্বভাবতই মুসলমান সেনাবাহিনীর অগ্রাভিযানের গতি অনেকটাই কমে গেল। আমর আর সুরাবিলকে তার অর্ধেক সেনাবাহিনীসহ ফিলিস্তিন দখলের মিশনে পাঠিয়ে দিয়ে উবায়দা খালিদকে সঙ্গে নিয়ে সিরিয়ার আরও উত্তরে তার অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখলেন এবং মার্চ ৬৩৬ নাগাদ এমেসা পর্যন্ত দখল করে ফেললেন।

উপায়ান্তর না পেয়ে বাইজান্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস অগত্যা তার রাজধানী এন্টিওখে দুই লাখ সৈন্যের এক বিশাল সেনাবাহিনী কনসেনট্রেট [১১] করলেন। তার পরিকল্পনা ছিল এই বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনী দিয়ে ফিলিস্তিন, মধ্য সিরিয়া আর উত্তর সিরিয়াজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অভিযানরত মুসলমান সেনাদলগুলোকে একের পর এক ধ্বংস করা।

৬৩৬ সালে জুন মাসের মাঝামাঝি একযোগে পাঁচ-পাঁচটা বাইজান্টাইন সেনাবাহিনী যখন তিন দিক দিয়ে এমেসার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল, বিভ্রান্ত আবু উবায়দা তখন ফের খালিদের শরণাপন্ন হলেন। শাহি ফরমানের তোয়াক্কা না করেই তিনি খালিদের হাতে কমান্ড তুলে দিয়ে বাহিনীর প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখাতে মনোযোগ দিলেন। অবশ্য বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীর এগিয়ে আসার খবর পাওয়ার পর থেকেই খালিদ মনে মনে এই কঠিন অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে ভাবছিলেন এবং হঠাৎই তার মাথায় আইডিয়াটা খেলে গেল। আইডিয়াটা এতটাই যুগান্তকারী ছিল যে স্রেফ এই একটা আইডিয়ার কারণে পরে ইতিহাসের মোড় ঘুরে গিয়েছিল আর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে ইসলামের ইউরোপযাত্রার পথ খুলে গিয়েছিল। তাই কমান্ড ফিরে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খালিদ একটা কনফারেন্স ডাকলেন এবং সব কমান্ডার আর অফিসারদের সেই কনফারেন্সে হাজির থাকার নির্দেশ দিলেন।

পাদটীকা

 [১] যুদ্ধে ফ্রন্ট বলতে শত্রুর দিকে নিজ বাহিনীর সম্মুখ প্রান্ত বোঝায়।

 [২] ক্যাম্পেইন বলতে সামরিক অভিযান বোঝায়। বাইরে থেকে কোনো শক্তি এসে দেশ দখলের জন্য ক্যাম্পেইন চালালে তাকে বলে ইনভেশন। ইনভেশনে লিপ্ত বাহিনীকে বলে ইনভেডিং সেনাবাহিনী বা এক্সপেডিশনারি সেনাবাহিনী।

 [৩] বাইরে থেকে এসে যোগ দিয়ে কোনো বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা।

 [৪] শত্রুকে অতর্কিতে ধ্বংস করতে লুকিয়ে থাকা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ফাঁদ।

 [৫] সেনাদলের এগিয়ে চলা।

 [৬] এটি একটি বেদুইন কৌশল। এ কারণেই সম্ভবত উটকে মরুভূমির জাহাজ বলে।

 [৭] মুসলমানদের সিরিয়া অভিযানে খালিদের নেতৃত্বে থাকা হালকা ক্যভুলরি রেজিমেন্টের রিজার্ভ বাহিনী। অগ্রাভিযানের সময় এরা মূল সেনাবাহিনীর সামনে অ্যাডভান্স গার্ড আর পিছু হটার সময় এরা রিয়ার গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। যুদ্ধ চলাকালে খালিদের এই মোবাইল গার্ড অপ্রত্যাশিত দিক থেকে ছুটে এসে শত্রুবাহিনীকে আক্রমণ করে তছনছ করে দিত। একে ক্যভুলরি রিজার্ভও বলা হয়, আরবিতে বলে তুলাইয়া মুতাহারিক্কাহ।

 [৮] একজন কমান্ডারের অধীন অফিসার ও সৈন্য।

 [৯] প্রধান উপদেষ্টা।

 [১০] সেনাদলের অধিনায়ক। কমান্ড করার দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন অফিসার।

 [১১] কোনো বিশেষ অভিযানের উদ্দেশ্যে সেনাদলকে একত্র করা।

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *