Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

বাইজান্টাইন প্রস্তুতি

কনফারেন্স রুমজুড়ে পিনপতন নিস্তব্ধতা; অবশেষে আবু উবায়দা সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে খালিদের পরামর্শ চাইলেন। প্রথমেই খালিদ গোয়ান্দাপ্রধানদের কাছ থেকে সর্বশেষ ইন্টেলিজেন্স আপডেট [১] জানতে চাইলেন। বাইজান্টাইন যুদ্ধবন্দী আর এমেসায় সদ্য রিক্রুটেড ডাবল এজেন্টদের [২] মাধ্যমে পাওয়া ইন্টেলিজেন্সের ভিত্তিতে ওয়ার গেমিং টেবিলজুড়ে সম্রাট হেরাক্লিয়াসের রণ পরিকল্পনার যে চিত্রটা ক্রমশ স্পষ্টতর হয়ে উঠছে তা নিঃসন্দেহে ভয়াবহ।

৬২৯ সালে সম্রাট হেরাক্লিয়াস গ্রিক টাইটেল ‘ব্যসিলিও’ গ্রহণের পর থেকেই তার প্রপাগান্ডিস্টরা [৩] যেকোনো বাইজান্টাইন অভিযানকেই যিশুর নামে চালিয়ে দিচ্ছিল, যুদ্ধক্ষেত্রেও রেলিক [৪] হিসেবে যিশুর ক্রুশের কাঠ বহন করা হতো সৈন্যদের মনোবল চাঙা রাখতে। এবারও এর কোনো ব্যতিক্রম হলো না। সিরিয়ান ফ্রন্টে তখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বাইজান্টাইনদের কোনো প্রতিরোধই কাজে আসছিল না, আর মুসলমানদের হাতে বাইজান্টাইনদের এমেসা নগরীও তখন পর্যন্ত অবরুদ্ধ। অগত্যা ৬৩৫ সালের শেষ দিকে সম্রাট হেরাক্লিয়াস ইসলামের এই প্রায় অপ্রতিরোধ্য অগ্রাভিযানকে ঠেকাতে এক আদি ক্রুসেডের ডাক দিলেন।

মে ৬৩৬ নাগাদ এমেসাবাসী যখন জিজিয়া কর দিয়ে মুসলমান সেনাবাহিনীর বশ্যতা মেনে নিতে রাজি হয়েছে, তখন উত্তর সিরিয়া আরও উত্তরে এন্টিওখজুড়ে রাশান, স্লাভ, ফ্রাঙ্ক, গ্রিক, রোমান, জর্জিয়ান, আর্মেনিয়ান আর খ্রিষ্টান আরবদের নিয়ে গড়ে ওঠা বাইজান্টাইন বহুজাতিক বাহিনী রণপোম নিতে শুরু করেছে।

৩০ হাজার সৈন্য নিয়ে একেকটা বাইজান্টাইন সেনাবাহিনী গড়ে উঠল, আর এমন পাঁচটা সেনাবাহিনী একযোগে এগোতে লাগল সিরিয়ান ফ্রন্টের দিকে। বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীতে আর্মেনিয়ানরা দুঃসাহসী যোদ্ধা হিসেবে সুপরিচিত ছিল। এই আর্মেনীয়দের কমান্ড করছিল জেনারেল ভাহান, আর্মেনিয়ান এই রাজা ছিলেন এমেসার সাবেক এই গভর্নর। খ্রিষ্টান আরবদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন প্রিন্স জাবালাহ; তিনি নিজের হাতের তালুর মতোই ভালো করে চিনতেন সিরিয়ান ফ্রন্টের আনাচকানাচ। কষ্টসহিষ্ণু যোদ্ধা বলে খ্যাত রাশান আর স্লাভদের কমান্ডে ছিলেন জেনারেল কানাতির। আর অল ইউরোপিয়ান বাহিনী কমান্ড করছিলেন জেনারেল গ্রেগরি আর জেনারেল দাইরজান।

সম্রাট হেরাক্লিয়াস জেনারেল ভাহানের হাতে যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাপতির দায়িত্ব তুলে দিয়ে থিওডোর টিথোরিয়াসকে বাইজান্টাইন বহুজাতিক বাহিনীর প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিলেন। টিথোরিয়াস আদতে ছিলেন বাইজান্টাইন কোষাধ্যক্ষ। সিরিয়ান ফ্রন্টে তাকে পাঠানোর কারণ ছিল দ্বিবিধ। প্রথমত, আর্মেনীয় জেনারেল ভাহানের সঙ্গে ইউরোপীয় কমান্ডার আর জেনারেলদের ব্যক্তিত্বের সংঘাত এড়িয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়াটা সহজ করতে। আর দ্বিতীয়ত, বিশাল এই বহুজাতিক বাহিনীর সৈন্যদের মধ্যে বেতন পাওয়া নিয়ে কোনো ধরনের গুজব যেন ছড়িয়ে না পড়ে।

তখন খেলাফতের মুসলমান সেনাবাহিনী চার ভাগে বিভক্ত হয়ে তিন ফ্রন্টজুড়ে অভিযানে ব্যস্ত। আমর বিন আল আস ফিলিস্তিনে, সুরাবিল জর্ডানে, কাসেরিতে ইয়াজিদ আর আবু উবায়দা ও খালিদ এমেসার উত্তরে লড়ছিল তখন। হেরাক্লিয়াস মুসলমান সেনাবাহিনীর এই স্প্লিট কন্ডিশনের [৫] ফায়দা লোটার ফন্দি আঁটলেন। তিনি চাইলেন তার বিশাল এই বহুজাতিক বাহিনী দিয়ে একের পর এক মুসলমান সেনাবাহিনীকে আউটনাম্বার [৬] করে গুঁড়িয়ে দিতে। প্রায় অবিশ্বাস্য বেলিজারেন্ট রেশিওর [৭] জন্যও ইয়ারমুখের যুদ্ধের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা হতে চলেছে।

ওদিকে উমর বনাম খালিদের বিরোধ নিয়ে কানাঘুষা তখন তুঙ্গে। অনেকেরই ধারণা, ব্যাপারটা ঈর্ষাজনিত। খালিদের কাছে শৈশবে মল্লযুদ্ধে আহত ও পরাজিত উমর হয়তো ক্ষমতায় এসে তার শোধ নিয়েছেন। অনেকের আবার ধারণা, রিদ্দাহ যুদ্ধে মালিককে হত্যা করে তার স্ত্রী লায়লাকে বিয়ে করার পর থেকেই উমর খালিদের ওপর ক্ষিপ্ত। তারা দুজনই বিখ্যাত সাহাবী ছিলেন এবং ইসলামের বিস্তারে দুজনই মহানবী (সা.)-এর কাছে প্রায় অপরিহার্য ছিলেন। যদিও তারা কখনোই একে অন্যের ব্যাপারে নিন্দা করেছেন বলে শোনা যায়নি; কিন্তু দুজনের মধ্যে একটা ঈর্ষার অস্তিত্বের কথা হয়তো একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার জো নেই। অবশ্য একটা জায়গায় এসে দুজন দুভাবে অনন্য, খালিদ ছিলেন অনবদ্য এক যোদ্ধা আর যুদ্ধবিদ এবং উমর ছিলেন স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে বিদগ্ধ এক রাষ্ট্রনায়ক।

লোকে ভাবতে শুরু করেছিল খালিদ যুদ্ধক্ষেত্রে পা রাখা মানেই সুনিশ্চিত বিজয়! তাই উমরের দাবি ছিল জীবন্ত কিংবদন্তি খালিদের ব্যাপারে মুসলমানদের মনে ক্রমেই দৃঢ় হতে থাকা এই কুসংস্কার থেকে ইসলামকে বাঁচাতেই তিনি খালিদকে কমান্ড থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যদিও আসন্ন ইয়ারমুখের যুদ্ধে দুজনই স্ট্র্যাটেজিক আর ট্যাকটিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে দারুণভাবে লড়ে হেরাক্লিয়াস-ভাহানের বহুজাতিক বাইজান্টাইন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে বেলিজারেন্ট রেশিওর ঐতিহাসিক হিসাব-নিকেশ আগাগোড়াই উল্টেপাল্টে দিয়েছিলেন।

পাদটীকা

[১] শত্রুর অবস্থান ও গতিবিধি কমে সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্য।

 [২] ভারী বকশিশের মাধ্যমে কিনে ফেলা শত্রুর গুপ্তচর।

 [৩] প্রচারকর্মী।

 [৪] পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন।

 [৫] বড় একটি বাহিনী সাময়িকভাবে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে একে অন্যের কাছ থেকে দূরে থাকা।

 [৬] সৈন্যসংখ্যায় প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি হওয়া।

 [৭] দুটি সেনাবাহিনীর পদাতিক, তীরন্দাজ, অশ্বারোহী সৈন্য ইত্যাদির নিরীখে তুলনামূলক অনুপাত।

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

2 thoughts on “মহাবীর হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) এর ইয়ারমুখের যুদ্ধ-৩”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *