Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় এক
জেনারেল খালিদ বিন ওয়ালিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী

https://scontent.fmaa1-2.fna.fbcdn.net/v/l/t1.0-9/13339590_10208233401424707_4196951253172599841_n.jpg?oh=8628cb5644f368986be734a2a192e337&oe=5836D372
খালিদ বিন ওয়ালিদের নামের ক্যালিগ্রাফিক উপস্থাপনা

হজরত আবু সুলায়মান খালিদ ইবনে আল ওয়ালিদ ইবনে আল মুঘিরাহ (রা.) [১] ছোট-বড় প্রায় শ খানেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও আজীবন অপরাজিত থাকায় ইতিহাসবিদেরা খালিদ বিন ওয়ালিদকে সমর ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেনাপতি বলে অনেক আগেই মেনে নিয়েছেন। এ ছাড়া অপেক্ষাকৃত ছোট সেনাদল নিয়েও অপ্রতিরোধ্য সব ক্যভুলরি [২] রণকৌশলের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের বিশাল সব শত্রুবাহিনীকে বারবার পরাস্ত করে তিনি সর্বকালের সেরা ক্যভুলরি জেনারেল হিসেবেও স্বীকৃত।

বাইজান্টাইন রোমান শাসনামলে ৬২৯ সালে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বাইজান্টাইন [৩] সম্রাট হেরাক্লিয়াসকে ইসলামের দাওয়াত দিতে চিঠি লিখলেন। মহানবী (সা.)-এর সেই দাওয়াতের চিঠি বহনকারী দূত লেভান্টের [৪] মুতা গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছালে ঘাসানিদ আরবেরা তাকে হত্যা করে। দূত হত্যা সব সময়ই অগ্রহণযোগ্য। অতএব মহানবী (সা.) মুতাবাসী বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হলেন।

https://scontent.fmaa1-2.fna.fbcdn.net/v/t1.0-9/13321695_10208233475586561_1888028079726719_n.jpg?oh=e772ccce540af5ddd9f96e4497ecf61f&oe=57EF9A43
সম্রাট হেরাক্লিয়াসের আমলের বাইজান্টাইন মুদ্রা

যায়িদ বিন হারিযাহর নেতৃত্বে ৩ হাজার সৈন্য নিয়ে মুসলমান বাহিনী মুতা অভিযানে রওনা দিয়েছে জেনে সম্রাট হেরাক্লিয়াস ১০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে এগিয়ে এলেন। শুরু হলো অসম এক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে খালিদ ইতিমধ্যে যুদ্ধ করতে করতে নয়টি তরবারি ভেঙে ফেলে দশমটি নিয়ে লড়ছিলেন। কিন্তু সংখ্যায় বাইজান্টাইনরা অনেক বেশি হওয়ায় মুসলমানেরা কোনোমতেই তাদের সঙ্গে আর কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। যুদ্ধ করতে করতে যায়িদ বিন হারিযাহ শহীদ হলে জাফর বিন আবু তালিব মুসলমান সেনাপতির দায়িত্ব নিলেন। যুদ্ধ করতে করতে তিনিও শহীদ হলে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা কমান্ড [৫] নিজের কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু তিনিও শাহাদতবরণ করার পর যুদ্ধরত মুসলমান যোদ্ধারা খালিদের হাতে সেনাপতিত্ব সঁপে দেন।  

দায়িত্ব পাওয়ার পর খালিদ সুকৌশলে মুসলমান বাহিনীকে বাইজান্টাইনদের থাবা থেকে সরিয়ে আনেন। তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করে নিশ্চিত পরাজয় থেকে মুসলমান বাহিনীকে রক্ষা করেন এবং তাদের নিরাপদে মদিনায় ফিরিয়ে আনেন। খালিদের এই কৃতিত্বের কথা শোনার পর মহানবী (সা.) বললেন, ‘অবশেষে একজন “সাইফুল্লাহ” [৬] যুদ্ধের হাল ধরেছে।’ সেই থেকে খালিদের নাম হয়ে গেল ‘সাইফুল্লাহ আল মাসলুল।’

আবু সুলায়মান খালিদ ইবনে আল ওয়ালিদ ইবনে আল মুঘিরাহ ৫৯২ সালে মক্কার কুরাইশ বংশের বনু মাখজুম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ওয়ালিদ ইবনে আল মুঘিরাহ ছিলেন বনু মাখজুম গোত্রের প্রধান। খালিদরা ছিলেন পাঁচ ভাই আর দুই বোন। জন্মের পরপরই আরব প্রথা অনুযায়ী তাকে এক বেদুইন দুধ-মায়ের কোলে তুলে দেওয়া হয়। এরপর পাঁচ কি ছয় বছর বয়সে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ গড়নের আর অসম্ভব ডানপিটে। ঐতিহ্যগতভাবেই কোরাইশদের সেরা যোদ্ধা আর কমান্ডাররা সবাই ছিলেন বনু মাখজুম গোত্রের। তাই ছেলেবেলা থেকেই তিনি ঘোড়ায় চড়া ও তরবারি, তির, বর্শা আর বল্লম চালানো শিখতে শুরু করেন। যদিও বল্লমই ছিল তার প্রিয় অস্ত্র; কিন্তু অন্যসব অস্ত্রেই তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। এ ছাড়া তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের সেরা কুস্তিগীরদের একজন এবং একবার মল্লযুদ্ধে উমর বিন খাত্তাবকে আছড়ে ফেলে তার পা ভেঙে দিয়েছিলেন। [৭]

খালিদের বাবা আল ওয়ালিদ ছিলেন ইসলামের ঘোর বিরোধী। মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর থেকে মক্কা বিজয়ের আগ পর্যন্ত মক্কার কোরাইশদের সঙ্গে মদিনাবাসীর যুদ্ধ লেগেই ছিল। বদরের যুদ্ধ ছিল মক্কাবাসীর সঙ্গে মদিনাবাসীর প্রথম যুদ্ধ। কিন্তু খালিদ এই যুদ্ধের সময় তাদের ব্যবসায়িক কাফেলার সঙ্গে সিরিয়ায় ছিলেন। বদরের যুদ্ধে খালিদের ভাই ওয়ালিদ বিন ওয়ালিদ মুসলমানদের হাতে বন্দী হন। যুদ্ধ শেষে খালিদ তার বড় ভাই হাশাম বিন ওয়ালিদকে নিয়ে মদিনা যান মুক্তিপণ দিয়ে ওয়ালিদকে ছাড়িয়ে আনতে। ৪ হাজার দিরহাম দিয়ে ওয়ালিদকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফেরার পথে ওয়ালিদ পালিয়ে মদিনা ফিরে যান এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

https://scontent.fmaa1-2.fna.fbcdn.net/v/t1.0-9/13319915_10208233482706739_4336295519124174405_n.jpg?oh=63546b25ce34315103228f45c4b2975a&oe=5805614D
উহুদের যুদ্ধে খালিদ

এরপর খালিদ উহুদ এবং খন্দকের যুদ্ধে কোরাইশদের হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়েন। ৬২৮ সালে হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে ১০ বছরের জন্য মক্কা আর মদিনাবাসীর ভেতর শান্তি নেমে আসে। এরই মধ্যে ওয়ালিদ মদিনা থেকে চিঠির মাধ্যমে খালিদকে বারবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দিতে থাকেন। একপর্যায়ে খালিদ মদিনা গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবং তার এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তার বাল্যবন্ধু ইকিরিমাহ এবং কোরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ক্ষিপ্তভাবে তাকে বিরত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ৩১ মে ৬২৯ সালে খালিদ মদিনা গমন করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তিনি একজন যোদ্ধা হিসেবে মহানবী (সা.)-এর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেন।

তখন প্রায় আরবজুড়েই নানান দেব-দেবীর মূর্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। আর প্রাচীন আরববাসী এসব দেব-দেবীর মূর্তি পূজা করত। মক্কার কাছেই ছিল আল উজ্জার মূর্তি ও মন্দির। আল উজ্জাকে গ্রিক পৌরাণিক দেবী আফ্রোদিতির আরব্য সংস্করণ বলা যেতে পারে। কোরাইশরা একে নিরাপত্তার দেবী হিসেবে পূজা করত। মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.) মক্কা এবং অন্যান্য আরব এলাকা থেকে মূর্তি অপসারণ শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৬৩০ সালের রমজান মাসে তার নির্দেশে খালিদ আল উজ্জার মূর্তি ধ্বংস করতে নাখলাহ যান।

xyz
আল উজ্জার মূর্তি

মূর্তি ধ্বংস করে ফিরে আসার পর মহানবী (সা.) জানতে চাইলেন মূর্তি ধ্বংসের সময় খালিদ অস্বাভাবিক কিছু দেখেছেন কি না। উত্তরে খালিদ যখন ‘না’ বললেন, তখন মহানবী (সা.) বললেন যে খালিদ যে মূর্তিটি ভেঙে এসেছে তা আল উজ্জার আসল মূর্তি না। লজ্জিত খালিদ পুনরায় নাখলাহ গিয়ে আসল আল উজ্জার মূর্তি খুঁজে বের করেন। খালিদের আসার সংবাদ পেয়ে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত আল উজ্জার মূর্তির গলায় একটি তরবারি ঝুলিয়ে দিয়ে পালিয়ে যান। [৮] খালিদ আল উজ্জার মূর্তি ভাঙা শুরু করতে যেতেই নগ্ন এক সেবাদাসী অপ্রকৃতস্থের মতো খালিদের পথরোধ করে দাঁড়ায় এবং ইথিওপিয়ান সেই সুন্দরী তাকে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু খালিদ নির্দ্বিধায় এক কোপে সেই নারীকে হত্যা করে আল উজ্জার মূর্তি ধ্বংস করে ফিরে আসেন।

এরপর খালিদ যান বনু জাধিমাহ গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে। কিন্তু তারা ইসলাম কবুল করতে সম্মত না হওয়ায় তিনি তাদের বন্দী করে নির্যাতন করতে শুরু করেন। ঘটনা শুনে মহানবী (সা.) অত্যন্ত রুষ্ট হন এবং খালিদকে ভর্ৎসনা করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করেন। পরে খালিদ বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে মুতার যুদ্ধে গমন করেন এবং যুদ্ধের মধ্যেই সেনাপতিত্ব পেয়ে সফলভাবে অভিযান পরিচালনার জন্য মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। পরের বছর ৬৩০ সালে কুরাইশদের বিরুদ্ধে মক্কা বিজয় অভিযানে খালিদ চার মুসলমান বাহিনীর একটির সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সে বছরেই তিনি বেদুইনদের বিরুদ্ধে হুনাইনের যুদ্ধে এবং তাইফ অবরোধ অভিযানে অংশ নেন। এরপর তিনি বাইজান্টাইনদের আগ্রাসন ঠেকাতে মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে তাবুক অভিযানে অংশ নেন। কিন্তু মুসলমান বাহিনী তাবুক পৌঁছানোর আগেই বাইজান্টাইনরা তাবুক ত্যাগ করে ফিরে যাওয়ায় মহানবী (সা.) খালিদকে ৪০০ সৈন্যসহ দুমা অভিযানে পাঠান।

দুমাতুল জান্দালের রাজকুমার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তার ইহুদি আর খ্রিষ্টান প্রজাদের নিয়ে ইসলামের দাওয়াত কবুল করেছিলেন। ৬৩১ সালের এপ্রিল মাসে খালিদ দুমাতুল জান্দালে পুনরায় অভিযান চালান এবং এবার সর্প দেবতা ওয়াদের মূর্তি ধ্বংস করেন। এরপর ৬৩১ সালে তিনি মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজে যোগ দেন এবং কথিত আছে যে হজের সময় তিনি মহানবী (সা.)-এর কিছু চুল সংগ্রহ করেছিলেন; যা তাকে যুদ্ধে অপরাজেয় করেছিল। [৯] ৬৩২ সালে মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পর অনেক শক্তিশালী আরব গোত্র মুসলমান খেলাফত শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে শুরু করে। ফলে শুরু হয় রিদ্দাহ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে খলিফা আবু বকর খালিদকে সেনাপতি নিয়োগ করলে তিনি মধ্য আরবে অভিযান পরিচালনা শুরু করেন।

রিদ্দাহ যুদ্ধে খালিদ

বুজাখা আর ঘামরার যুদ্ধে তিনি স্বঘোষিত নবী তুলেইহার বাহিনীকে পরাস্ত করেন। পরে তুলেইহা স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আবু বকরের কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাইলে আবু বকর তাকে ক্ষমা করে দেন। আরও পরে সাসানিদদের বিরুদ্ধে বিখ্যাত নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে তুলেইহা শাহাদতবরণ করেন। এরপর খালিদ নাক্রা এবং জাফারের যুদ্ধে বনু সালিম গোত্রের নেত্রী সালমার সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সালমাকে হত্যা করেন। এ যুদ্ধের পর মদিনার আশপাশের অন্যান্য গোত্র খেলাফতের বশ্যতা স্বীকার করে নিলেও মালিক বিন আবু নুয়ারাহ এর বনু ইয়ারবু গোত্র মুসলমান হয়েও খেলাফতকে অস্বীকার করল।

মালিক সরাসরি খালিদের সঙ্গে কোনো যুদ্ধে না জড়িয়ে আরেক স্বঘোষিত নবী সাজ্জাহর সঙ্গে হাত মেলান। কিন্তু খালিদ দ্রুতই তাকে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হন। খালিদ রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মালিককে হত্যা করেন এবং তার স্ত্রী লায়লাকে বিয়ে করেন। উমর বিন খাত্তাব খালিদের এমন আচরণের ঘোর বিরোধিতা করেন এবং অনেকেই মনে করেন খালিদ-উমরের মনোমালিন্যের অনেক কারণের ভেতর এ ঘটনাটি অন্যতম। পরে ৬৩২ সালের ডিসেম্বরে ইয়ামামার যুদ্ধে আরেক স্বঘোষিত নবী মুসাইলিমাহর বাহিনীকে পরাস্ত করার মধ্য দিয়ে রিদ্দাহ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয়।

রিদ্দাহ যুদ্ধে খালিদ
(ছবিঃ উইকিপিডিয়া)

রিদ্দাহ যুদ্ধের পর খলিফা আবু বকর খেলাফতকে সুসংহত আর সম্প্রসারিত করতে বাইজান্টাইন আর পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে ১৮ হাজার সৈন্য নিয়ে খালিদ পার্সিয়ান অভিযান শুরু করেন। সেখানে তিনি সালাসিল, ইউফ্রেতিস, ওয়ালাজা আর উল্লাইসের যুদ্ধে জয়ী হয়ে ৬৩৩ সালের মে মাসের ভেতর পার্সিয়ানদের হাত থেকে লোয়ার মেসোপটেমিয়া দখল করে নেন। এরপর তিনি আনবার শহর অবরোধ করেন এবং জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ নাগাদ আইন আল তামর পর্যন্ত দখল করে নেন।

এ পর্যায়ে দুমাতুল জান্দালে বিদ্রোহীরা আয়াজ বিন ঘানামের ছোট্ট মুসলমান বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে জেনে দুমাতুল জান্দালে ছুটে গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। সেখান থেকে তিনি পবিত্র হজব্রত পালনের উদ্দেশে মক্কা গমন করেন এবং ফেরার পথে বিশাল এক পার্সিয়ান বাহিনী জড়ো হওয়ার সংবাদ পেলেন। বিশাল এই সেনাবাহিনী চারটি গ্যারিসনে [১০] জড়ো হয়েছিল। খালিদ মুজাইয়াহ, সানিঈ ও জুমাইলের পৃথক যুদ্ধে এই বাহিনীকে একে একে পর্যুদস্ত করেন।

পারস্য অভিযানে খালিদ

এবার খালিদ পার্সিয়ান রাজধানী দখলের পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু পার্সিয়ান রাজধানী দখলের আগে ফিরাজ আর কাদেশিয়াহর গ্যারিসন দখল করা জরুরি। অতএব ৬৩৩ সালের ডিসেম্বরে ফিরাজের যুদ্ধে তিনি ফিরাজ শহর দখল করে এবার কাদেশিয়াহর পথে রওনা দেন। পথিমধ্যেই তিনি বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে সিরিয়ান ফ্রন্টের কমান্ডার হিসেবে যোগদানের নির্দেশ পান এবং পার্সিয়ান ফ্রন্ট ত্যাগ করে সিরিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন।

৬৩৪ সালের জুন নাগাদ খালিদ সিরিয়ান ফ্রন্টে যোগ দেন। পথে কারাতাইন আর হাওয়ারিনের যুদ্ধে দুটো বাইজান্টাইন মরু দুর্গ দখল করেন। এরপর তিনি বসরার দিকে এগোতে থাকেন, যেখানে আবু উবায়দার মুসলমান বাহিনী বসরা অবরোধ করে আছেন। ৬৩৪ সালের মধ্য জুলাইয়ে বসরার পতনের মধ্য দিয়ে ঘাসানিদ বংশের পতন ঘটে। ৩০ জুলাই খালিদ আজনাদাইনের যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের পরাজিত করেন এবং লেভান্টজুড়ে বাইজান্টাইন আধিপত্যকে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।

এবার খালিদ দামেস্ক দখলের উদ্দেশে অগ্রসর হলে দামেস্কের গভর্নর থমাস [১১] তাকে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসেন। থমাসের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে ৬৩৪ সালের ২০ আগস্ট খালিদের মুসলমান বাহিনী দামেস্ক অবরোধ করে এবং ৩০ দিনের মাথায় দামেস্ক দখল করে নেন। দামেস্ক অবরোধ চলাকালেই আবু বকর মারা যান এবং উমর বিন খাত্তাব খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন। খলিফা হয়েই উমর খালিদকে সিরিয়ান ফ্রন্টের কমান্ড থেকে অপসারণ করে আবু উবায়দাকে সেনাপতি মনোনীত করেন।

মধ্য সিরিয়া মুসলমানদের দখলে আসার পর উত্তর সিরিয়ার সঙ্গে প্যালেস্টাইনের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল। আবু উবায়দা তার সেনাবাহিনীকে চার ভাগে ভাগ করে চারদিকে অভিযান চালাতে শুরু করলেন। মুসলমানদের এমন অগ্রাভিযান অব্যাহত থাকলে দ্রুতই একসময় তারা গোটা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াবে জেনে সম্রাট হেরাক্লিয়াস বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনী জড়ো করে মুসলমান সেনাবাহিনীকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলেন। আবু উবায়দা খালিদকে তার ক্যভুলরি কমান্ডার এবং প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিলেন। খালিদের পরামর্শে ৬৩৬ সালের ২০ আগস্ট ইয়ারমুখ প্রান্তরে মুসলমান বাহিনী বাইজান্টাইন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে।

https://scontent.fmaa1-2.fna.fbcdn.net/t31.0-8/p720x720/13323463_10208233537068098_3729408861148082347_o.jpg
পারস্য অভিযানে খালিদ
(ছবিঃ উইকিপিডিয়া)

সিরিয়া অভিযানে খালিদ

ইয়ারমুখে বাইজান্টাইনদের পরাস্ত করার পর মুসলমান বাহিনী লেভান্টে বাইজান্টাইনদের শেষ শক্ত ঘাঁটি জেরুজালেম অবরোধ করেন। দীর্ঘ চার মাস অবরোধের পর ৬৩৭ সালের এপ্রিলে উমরের উপস্থিতিতে জেরুজালেম আত্মসমর্পণ করে। জেরুজালেম পতনের পর আবু উবায়দা আর খালিদ উত্তর সিরিয়া অভিযানে নামলেন। পথে হাজিরের যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের পরাস্ত করে ৬৩৭ সালের অক্টোবরের ভেতর আলেপ্পো পর্যন্ত দখলে নিয়ে নেন। এরপর আয়রন ব্রিজের যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের ফের পরাজিত করে তারা বাইজান্টাইন রাজধানী এন্টিওখ অবরোধ করেন এবং ৩০ অক্টোবর এন্টিওখের পতন হয়।

এরপর খালিদ আরও উত্তরে এগোতে থাকেন। তিনি সফল অভিযানের মাধ্যমে জাজিরা, এডেসা, আমিদা, মালাটিয়া, আর্মেনিয়া আর মধ্য আনাতলিয়া পর্যন্ত দখল করে নেন। এমতাবস্থায় খলিফা উমর মুসলমান বাহিনীদের অগ্রাভিযান বন্ধ করে ইতিমধ্যে দখল করা এলাকায় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা জোরদারে মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে আনাতলিয়া আর আর্মেনিয়া অভিযানের মাধ্যমে খালিদের বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

সিরিয়া অভিযানে খালিদ
(ছবিঃ উইকিপিডিয়া)

এমেসা থাকাকালে একবার খালিদ এক বিশেষ পানীয় দ্বারা গোসল করেন যাতে অ্যালকোহল মেশানো ছিল। গুপ্তচরের মাধ্যমে উমর বিষয়টি জানতে পারেন এবং খালিদের কাছে এ ঘটনার লিখিত ব্যাখ্যা চান। ইসলামে অ্যালকোহল পানে নিষেধাজ্ঞা আছে কিন্তু গোসলের ব্যাপারে কিছু বলা নেই মর্মে ব্যাখ্যা দেন খালিদ এবং উমর তা মেনে নেন।

আবার ৬৩৮ সালে মারাস দখলের পর বিখ্যাত কবি আসওয়াস খালিদের গুণকীর্তন করে এক কবিতা লিখে খালিদের মন জয় করে নেন। খুশি হয়ে খালিদ তাকে ১০ হাজার দিরহাম উপহার দেন। উমর এ ঘটনা জানতে পেরে আবু উবায়দাকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। কারণ খালিদ যদি সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ দিয়ে থাকেন, তবে তা ছিল খেয়ানত। আর যদি নিজ সম্পদ থেকে তা দিয়ে থাকেন তাহলে তিনি অপব্যয়ী। কিন্তু আবু উবায়দা নিজেই খালিদের ভীষণ ভক্ত ছিলেন। তাই তিনি এই অপ্রিয় কাজটি করতে অপারগতা প্রকাশ করলে অবশেষে বিলাল ইবনে রিবাহ খালিদকে এমেসা ডেকে পাঠান এবং ওই অর্থের উৎস জানতে চান। খালিদ ওই অর্থ তার নিজের বলে দাবি করলে অমিতব্যয়িতার অভিযোগে উমরের নির্দেশে তাকে মুসলমান সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করেন।

ইউরোপের দিকে ধাবমান খালিদ
(ছবিঃ উইকিপিডিয়া)

বরখাস্ত হওয়ার পর খালিদ তার মোবাইল গার্ডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মদিনা ফিরে যান এবং উমরের দরবারে হাজির হয়ে উমরের এমন সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চান। খালিদের বিরুদ্ধে উমর তার অবস্থান এভাবে ব্যাখ্যা করলেন যে মুসলমানেরা ভাবতে শুরু করেছে যে খালিদকে ছাড়া মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধে জেতা অসম্ভব, যা অগ্রহণযোগ্য। খালিদ উমরের এই আশঙ্কাকে মেনে নিলেন এবং এমেসা ফিরে গিয়ে অবসর জীবনযাপন শুরু করলেন। ৬৪২ সালের হজ শেষে উমর অসমাপ্ত পার্সিয়ান অভিযান পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা করেন এবং খালিদকে সে অভিযানের সেনাপতি হিসেবে পুনর্নিয়োগের কথা চিন্তা করেন। কিন্তু মদিনা পৌঁছাতেই তিনি জানতে পারলেন যে খালিদ বিন ওয়ালিদ আর নেই।

খালিদ যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদতবরণের জন্য উদগ্রীব ছিলেন। তিনি বলতেন, ‘আমি এত উদগ্রীব হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদতবরণ করতে চেয়েছি যে আমার শরীরে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে কোনো আঁচড় বা ক্ষতের দাগ নেই। অথচ আজ আমি একটা বৃদ্ধ উটের মতো বিছানায় শুয়ে মরতে বসেছি।’ উত্তরে খালিদের স্ত্রী বলতেন, ‘আপনি আল্লাহর তরবারি আর আল্লাহর তরবারি কি কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ভাঙতে পারে? আপনার নিয়তি শহীদ হওয়ার নয়, আপনার নিয়তি অপরাজেয় হয়ে মরবার।’

https://scontent.fmaa1-2.fna.fbcdn.net/v/t1.0-9/13319980_10208233629150400_232269845067548856_n.jpg?oh=b2d3d9e9e09448e4e495e255fa6ea088&oe=58377448
খালিদ বিন ওয়ালিদ মসজিদ, সিরিয়া

খলিফা উমর কারও মৃত্যুর পর সেই মৃতের জন্য বিলাপ করা পছন্দ করতেন না এবং এ ব্যাপারে তিনি কড়া নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিলেন। কিন্তু খালিদের মৃত্যুর পর বনু মখজুমের নারীরা যখন মাটিতে গড়াগড়ি করে বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন, তখন উমর তাদের বাধা দিতে মানা করলেন। কারণ তিনি নিজেও জানতেন যে মানব সভ্যতার ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো খালিদ হয়তো আর কখনো জন্মাবে না, তাই এই বিলাপ আর আহাজারি অনর্থক নয়। [১২]

পাদটীকা

[১] হজরত আবু সুলায়মান খালিদ ইবনে আল ওয়ালিদ ইবনে আল মুঘিরাহ (রা.)-কে আরবের লোকেরা খালিদ, খালিদ বিন ওয়ালিদ অথবা আবু সুলায়মান (সুলায়মানের পিতা- খালিদের বড় ছেলের নাম ছিল সুলায়মান) নামে ডাকত। পড়ার সুবিধার্থে আমরাও এই বইয়ে শুধু মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছাড়া বাকি সব চরিত্রকেই তাদের ছোট নামেই পড়ব।

[২] যে সব যোদ্ধা ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করে তাদের বাহিনীকে ক্যভুলরি বলে। ক্যভুলরি যোদ্ধাদের ক্যভুলরিমেন, হর্সমেন, ড্রাগুন, ট্রুপার, সাঁজোয়া, অশ্বারোহী অথবা ঘোড়সওয়ার বলেও ডাকা হয়। তবে উট কিংবা হাতির পিঠে চড়ে যুদ্ধ করা যোদ্ধাদের সাধারণত ক্যভুলরি বলা হয় না। ঘোড়ার পিঠে চড়া ক্যভুলরি যোদ্ধারা পদাতিক যোদ্ধাদের তুলনায় উঁচুতে থাকায় পদাতিকদের চেয়ে বেশি দূর পর্যন্ত দেখতে পেত এবং ঘোড়ার গতিকে কাজে লাগিয়ে ওপর থেকে আঘাতের সুবিধাও পেত। তা ছাড়া ঘোড়ার গতির সুবিধা নিয়ে দ্রুত হামলা করে আবার দ্রুত সরে যেতেও পারত। ফলে দ্রুত স্থান পরিবর্তিন করে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ক্যভুলরি বাহিনী আক্রমণ করে পদাতিক শত্রুদের চমকে দিয়ে যুদ্ধে হারিয়ে দিত। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়ার পরিবর্তে ট্যাংক একই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।

[৩] প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য যখন আকারে বিশাল হয়ে পড়ে, তখন সাম্রাজ্য শাসনের সুবিধার্থে দুটো রাজধানী স্থাপন করা হয়। একটি রোমে আরেকটি তুরস্কের কনস্টান্টিনোপলে। কনস্টান্টিনোপল থেকে একজন সম্রাট পূর্ব ইউরোপ আর প্রাচ্য শাসন করতেন। এই সাম্রাজ্যকে বলা হতো বাইজান্টাইন রোমান বা শুধু বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য।

[৪] বাইজান্টাইন রোমান শাসনামলে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পাশে অবস্থিত ফিলিস্তিন, ইসরায়েল, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া এবং তুরস্কের কিছু অংশকে একত্রে লেভান্ট ডাকা হতো।

[৫] বাহিনী পরিচালনা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব।

[৬] আল্লাহর তরবারি।

[৭] উমর বিন খাত্তাব সম্পর্কে খালিদের ভাগনে ছিলেন।

[৮] সম্ভবত পুরোহিতের ধারণা ছিল যে সেই তরবারি ব্যবহার করে অন্তিম মুহূর্তে আল উজ্জা নিজ মূর্তিকে রক্ষা করতে পারবে।

[৯] কথিত আছে যে খালিদ মহানবী (সা.)-এর সেই চুল একটি লাল টুপিতে সেলাই করিয়ে নিয়েছিলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সব সময় ওই টুপি মাথায় দিয়ে যুদ্ধ করতেন।

[১০] সেনা ছাউনি, সেনানিবাস অথবা দুর্গ।

[১১] থমাস ছিলেন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের মেয়ের জামাই।

[১২] খালিদ এবং উমরের মনোমালিন্য ইতিহাসস্বীকৃত। কিন্তু তারা কখনোই একে অন্যের প্রতি বিরাগ বা কুৎসা প্রকাশ করেননি। উমর খলিফা হওয়ার পর খালিদকে মুসলমান সেনাবাহিনীর কমান্ড থেকে সরিয়ে দিলে খালিদ তা বিনা তর্কে মেনে নেন এবং বলেন, ‘যদি আবু বকর ইন্তেকাল করে থাকেন আর উমর নতুন খলিফা নির্বাচিত হয়ে থাকেন, তো আমাদের সবারই উচিত খলিফা উমরের প্রতি অনুগত থাকা এবং তার নির্দেশ মেনে চলা।’ কথিত আছে যে উমর তার মৃত্যুশয্যায় এই বলে আফসোস করেছিলেন যে খালিদ বেঁচে থাকলে তিনি খালিদের হাতেই খেলাফতের দায়িত্ব তুলে দিতেন। এ ছাড়া একবার খালিদের আরও একটি যুদ্ধ জয়ের কথা শুনে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে নিশ্চয় আবু বকর তার চেয়ে ভালো করে মানুষ চিনতে পারতেন এবং সত্যি খালিদ ছিলেন ইসলামের ঢালস্বরূপ।

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *