Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় ২১

কনফারেন্স রুম থেকে সবার শেষে বের হয়ে প্রথমে নিজের মোবাইলটি সংগ্রহ করে মোনাকে ফোন দিল সাইরাস।

       ‘কী ডিসিশন হল, জানু?’ জানতে চাইল মোনা।

       ‘এখনও কোনো ডিসিশন হয়নি, রাত আটটায় আবার বসবে সবাই।’

       ‘তোমার থাকা লাগবে?’

       ‘বুঝতে পারছি না, কেউ তো কিছু বলেনি।’

       ‘লাঞ্চ করতে পেরেছিলে?’

       ‘না, নাস্তা করেছি কনফারেন্সের সময়।’

       ‘ডিনার?’

       ‘এখন ক্যাফে থেকে ভারী কিছু খেয়ে নেব। কনফারেন্স কতক্ষন চলবে কে জানে।’

       ‘ওকে। সেই ভালো।’

       ‘রাখছি তাহলে। চান্স পেলে আবার কল দেব।’

       ‘ওকে, বাই।’

       ‘বাই।’

কথা শেষে মোবাইল পকেটে রাখতে গিয়ে স্ক্রিনে ভেসে উঠা মিসড কলটি দেখে বেশ অবাকই হলো সাইরাস। আবরার ফোন করেছে!

আবরার ফ্রেঞ্চ আর্মির সার্জেন্ট। মালিতে ওদের ব্যানব্যাটের পাশেই ফ্রেঞ্চ আর্মির ক্যাম্প। এই ক্যাম্প থেকেই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের পাশাপাশি ফরাসিদের অপারেশন বারখানে পরিচালিত হয়। ফ্রেঞ্চ ইউনিটকে ওরা বলে ফরেন লিজিওন। এইসব ফরেন লিজিওনগুলো বিদেশী সৈন্যদের নিয়ে গড়া। বিশ্বের যেকোনো দেশের নাগরিক এই ফরেন লিজিওনে যোগ দিতে পারে। সার্জেন্ট আবরার বাংলাদেশী। পড়াশোনা করতে ইংল্যান্ডে এসেছিল। সেখান থেকেই শখের বসে ফ্রেঞ্চ এম্বেসিতে গিয়েছিল রিক্রুটিং পরীক্ষা দিতে।

২০১৩ সালে অপারেশন সার্ভেল চলার সময় এক্সপ্লোসিভ অর্ডন্যান্স ডিসপোজাল (ইওডি) এক্সপার্ট হিসেবে প্রথমবার মালিতে গিয়েছিল সে এবং টানা দুই বছর ছিল। পরে এক বছরের জন্য সেন্ট্রাল অফ্রিকান রিপাব্লিকে মোতায়েন ফ্রেঞ্চ ফোর্সের সাথে থাকার পর পদোন্নতি পেয়ে ফ্রান্সে চলে গিয়েছিল। গতবছর কর্পোরাল থেকে সার্জেন্ট পদে পদোন্নতি পেয়ে এবছর ফের মালিতে গেছে ইওডি প্রশিক্ষক হিসেবে। ফ্রেঞ্চ ইওডি এক্সপার্ট হিসেবে প্রায়ই ব্যানব্যাটের সদস্যদের সাথে একযোগে ইওডি ধ্বংস করতে যেতে হয় তাকে; মাঝেমাঝে ক্লাশও নিতে আসে ইওডির উপর। এভাবেই সাইরাসের সাথে তার পরিচয়। বামাকোতে ফিউনারেল প্যারেডের সময় তার পাশেই ছিল সারাক্ষন।

ঘড়িতে সময় দেখে সাইরাস বুঝল যে মালিতে এখন ভর দুপুর। তাই আবরারকে কল ব্যাক করল নির্দ্বিধায়। দুই রিং বাজতেই কল রিসিভড হলো আর আবরারের চেনা কন্ঠ ভেসে এলো, ‘সালাম, স্যার। বাসার সবাই ভালো?’

‘ওয়ালাইকুমাসসালাম। হ্যাঁ, সবাই ভালো আছি। তোমাদের কী খবর?’

‘সো সো, স্যার। রাশেদের ভিডিওটা তো দেখসেন স্যার, নাকি?’

‘হ্যাঁ, দেখলাম।’

‘এখন কী করবেন স্যার, আপনারা?’

‘আগে তো ওর লোকেশন কনফার্ম করতে হবে, তারপর না কিছু করার প্রশ্ন।’

‘তা ঠিক। অবশ্য ভিডিও দেখে বোঝা যাচ্ছে আকিত এর হাতে আছে, তারমানে তিম্বাক্তুর আশেপাশেই কোথাও হবে। আকিম থেকে বের হয়ে এরা নতুন দল করেছে। এখনও এমেচার।’

‘সমস্যা তো সেখানেই, আবরার।’

‘কেন স্যার?’

‘কারন প্রফেশনালরা প্রেডিক্ট্যাবল, কিন্তু এমেচাররা কখন কী করে বসে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।’  

‘তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। রাশেদের বিনিময়ে বাংলাদেশী পিস্কিপার্স উইথড্র করাতে চাইছে, শুনেই বোঝা যায়।’

‘হুম।’

‘আপনারা কিন্তু আমাদের হেল্প নিতে পারেন।’

‘নিশ্চয়। বারখানের হেল্প ছাড়া তো ওখানে কিছুই করা সম্ভব না। কিন্তু ব্যানব্যাটের রিকোয়েস্টে বারখানে মুভ করবে বলে মনে হয়না। স্টেট লেভেলে এগ্রি করতে হবে আগে।’

‘আপনার কি মনে হয়, পারবে বাংলাদেশ ফ্রান্সকে রাজি করাতে?’

‘আমি জানিনা, ব্রাদার। স্টেট লেভেলের এফেয়ার্স নিয়ে তেমন ধারনা নেই আমার।’

‘দেখা যাক, স্যার। যদি বারখানে কোওপারেট করতে রাজি হয়, আমাকে আলাদা করে চেয়ে নিয়েন কিন্তু। তিম্বাক্তুতে রেইড করতে চাইলে আপনাদের ইওডি সাপোর্ট লাগবেই। ওরা অনেক বুবি ট্র্যাপ ইউজ করে। আর আমি এদের ইওডি খুব ভালো করে চিনি, স্যার।’

‘হুম, এ ব্যাপারে মালিতে তুমিই সেরা, সন্দেহ নেই। অবশ্যই তোমাকে চাইব যদি সেই সুযোগ আসে আরকি।’

‘ঠিক আছে, স্যার। পরে আবার কথা হবে তাহলে। বাই’

‘বাই।’

আবরারের সাথে কথা শেষ করে আতাউরকে কল করল সাইরাস। দুবার রিং হতেই কল রিসিভ করল আতাউর, যেন সাইরাসে কলের অপেক্ষাতেই ছিল সে। 

‘স্লামালেকুম, স্যার।’

‘ওয়ালাইকুম আসসালাম, আতাউর। সব ঠিক?’

‘জ্বি, স্যার। ফোর্স কমান্ডার স্যার ভিজিটে আসছিলেন। রাশেদ স্যারের জন্য নাকি কম্বিং অপারেশন চালানো হবে। ভিডিওটা সবাই দেখসে। আমরা এখন কি করব, স্যার?’

‘এখনও কোনো ডিসিশন হয়নি, আতাউর। হলে জানাব। আমি ছুটি ক্যান্সেল করে মালিতে চলে আসার চেষ্টা করছি।’

‘আপনি একা আর কী করবেন, স্যার? ডিসিশন হোক আগে, স্যার।’

‘হু’

‘স্যার…’

‘বল?’

‘ক্যাথি স্যার ডাকসিল,’ আমতা আমতা করে বলে আতাউর।

কয়েক মুহুর্ত নিরব থেকে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাইরাস বলে, ‘আতাউর, আমি না করেছিলাম তোমাকে।’

‘উনার কাছে রাশেদ স্যারের ব্যাপারে মনেহয় কোন তথ্য আছে, স্যার,’ দ্রুত বলে উঠে আতাউর, ‘উনিও ভিডিওটা দেখসেন।’

‘কি তথ্য?’

‘আমাকে বলেন নাই, স্যার। আপনাকে কল করতে বলসেন।’

‘আচ্ছা, কল করব।’

‘জ্বি, স্যার।’

‘আতাউর।’

‘জ্বি, স্যার?’

‘তোমার ম্যাডাম যদি ক্যাথির ব্যাপারটা জানেন তাহলে খুব কষ্ট পাবেন আর আমিও এসব ঝামেলা চাই না।’

‘জ্বি, স্যার।’ 

‘এর পর ক্যাপ্টেন ক্যাথরিন যদি তোমার সাথে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করে তুমি বলবে অফিশিয়াল চ্যানেলে আমার সাথে কথা বলতে। বুঝেছ তুমি?’

‘জ্বি, স্যার।’

‘সবাইকে আমার সালাম দিও।’

‘জ্বি, স্যার।’

ফোন কেটে দিয়ে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে নিরবে তাকিয়ে থাকে সাইরাস। রাশেদের ব্যাপারে কী তথ্য থাকতে পারে ক্যাথির কাছে? নাকি ওর সাথে কথা বলার বাহানা খুঁজছে সে? 

সাইরাসের কাছে ক্যাথির নম্বর আছে। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে ডায়াল করল সেই নাম্বারে।

‘হ্যালো’

‘সাইরাস বলছি।’

‘কেমন আছো?’

‘ভাল আছি। ধন্যবাদ। তোমার কী খবর?’

‘আমিও ভাল আছি। এই মুহুর্তে অনেক বেশি ভাল,’ ক্যাথির মসৃন কন্ঠে উচ্ছাস ছাপিয়ে পরে।

সাইরাস সাবধানে ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘রাশেদের ব্যাপারটা নিয়ে আমরা খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’

‘ভিডিওটা দেখেছি আমি,’ প্রসঙ্গ বদলে যাবার সাথে সাথে ক্যাথির কন্ঠ ম্রিয়মান শোনায়। ‘তোমরা কি করবে এখন?’

‘এখনও কোনো অর্ডার পাইনি।’

‘পেলেও তো আমাকে জানাবে না, জানি।’

‘তেমন কিছুই না। আসলে কোনো প্রগ্রেস নেই বলার মত।’

‘শোনো, আমি একটা জিনিস শেয়ার করতে চাচ্ছিলাম। তাই কল করতে বলেছিলাম।’

‘আমি শুনছি।’

‘আমার মেইন রোল ডাক্তারি হলেও রাশেদের মত আমিও একজন দোভাষী। আমাদের কন্টিনজেন্টের প্রয়োজনে মাঝেমধ্যেই দোভাষী হিসেবে কাজ করে থাকি।’

‘হুম।’

‘আমাদের দোভাষীদের একটা এসোসিয়েশন আছে, জানো তো?’

‘হ্যা, আই আই ইউ?’

‘ঠিক তাই, ইন্টারপ্রেটারস ইন ইউনিফর্ম। আই আই ইউ এর এক্টিভ মেম্বার হিসেবে আমাদের দোভাষীদের অনেকেই একটা ডগ ট্যাগ গলায় চেইনের সাথে ব্যবহার করে। সেই ডগ ট্যাগের ভেতর ছোট্ট একটা ডিভাইস লাগানো আছে যা দিয়ে আই আই ইউ এই ডগ ট্যাগের ইউজারদের কেউ বিপদে পরলে গুগুল ম্যাপে তার লোকেশন দেখতে পায়।’

‘রাশেদের কাছে কি এই ডগট্যাগ আছে?’ সাইরাসের কন্ঠে আগ্রহ ফুটে উঠে।

‘হ্যা, আমিই ওকে আই আই ইউ মেম্বারশিপ পেতে হেল্প করেছিলাম। তাই জানি ওর কাছেও এই ডগট্যাগ একটা আছে।’

‘তারমানে কি আই আই ইউ জানে রাশেদের প্রেজেন্ট লোকেশন!’ উত্তেজিত কন্ঠে জানতে চায় সাইরাস।

‘এখনও না।  সাধারন গুগল ম্যাপের উপর বেইজ করেই এই সফটওয়্যারটি কাজ করে। তাই লোকেশনের এক্যুরেসিও সামান্য ভ্যারি করে। তবে আসল কথা হল, এটা সারাক্ষণ অন থাকে না। কেউ বিপদে পরলে পরপর পাঁচ বার ক্লিক ডগট্যাগটা এক্টিভেট হয় আর লোকেশন দেখায়।’

‘এক্টিভেট হলে জানব কিভাবে, ক্যাথি?’ অস্থির কন্ঠে জানতে চায় সাইরাস।

‘আমি খোঁজ রাখছি আর তোমাকে লিঙ্ক দিয়ে রাখছি। তুমিও আমার আইডি পাসওয়ার্ড দিয়ে লগ ইন করে চেক করতে পারবে যখন ইচ্ছা।’ দ্রুত জবাব দেয় ক্যাথি।

‘বুঝেছি,’ হাতঘড়িতে সময় দেখে বলে সাইরাস, ‘আমাকে রাখতে হবে এবার। আর কিছু থাকলে আমাকে ইনবক্সে দিয়ে রেখো, প্লিজ।’

‘কল করতে পারব?’

‘না, প্লিজ,’ ইতস্তত করে জবাব দেয় সাইরাস।

‘বুঝেছি। তোমার বউ বাচ্চাকে আমার আদর দিও।’

‘আচ্ছা। পরে আবার কথা হবে। বাই।’

‘বাই।’ ক্যাথির কন্ঠে কষ্টের প্রতিধ্বনি সাইরাসের কান এড়ায় না।  

কথা শেষে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে পা বাড়ালো সাইরাস। রাতের কনফারেন্স শেষে কী সিদ্ধান্ত হতে পারে তা হাঁটতে হাঁটতেই আন্দাজ করবার চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যাপারটা এতো বেশি স্ট্র্যাটেজিক যে এর কোনো কূলকিনারা করতে ব্যর্থ হল। বরং সুদূর মালিতে টেররিস্টদের হাতে বন্দি রাশেদের অসহায় মুখটি বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সে এমন মুমুর্ষ অবস্থায়ও ভাবছে সাইরাস তাকে বাঁচাতে পারবে! কিন্তু কিছু করতে না পারার অক্ষম ক্রোধ আর নিদারুণ মর্মপীড়া ভীষণভাবে জর্জরিত করছে সাইরাসকে।

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

1 thought on “মিশন তিম্বক্তু (একুশ)”

  1. Pingback: মিশন তিম্বক্তু (বিশ) – Delwar Hossain Khan

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *