Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
“Peacekeeping is not a job for soldiers, but only soldiers can do it.”
Former UN secretary-general Dag Hammarskjöld

অধ্যায় ১

গসি কমিউন, গুরমা রারুস সার্কেল, তিম্বুক্তু রিজিয়ন, মালি  

বিস্ফোরণের হঠাৎ ধাক্কায় সাদা আর্মার্ড পার্সোনাল ক্যারিয়ারের উপর থেকে শূন্যে ছিটকে গেল রাশেদ! ঘটনাটি ঘটল চোখের পলকেই! প্রথমে উড়ে গিয়ে সাহারা মরুর পাথুরে মাটিতে আছড়ে পড়ল তার দেহটি, তার পরপরই গড়াতে গড়াতে রাস্তা থেকে প্রায় দশ পনের গজ দূরের একটি শুকনো নালায় গিয়ে স্থির হলো। পেছনে তার ভারী আর্মার্ড পার্সোনাল ক্যারিয়ারটি ইতোমধ্যেই একটা ডিগবাজি খেয়ে রাস্তার ঠিক পাশে উল্টে পরে আছে, কিন্তু তা দেখতে পাবার আগেই আঘাতের প্রচন্ডতায় সংজ্ঞা হারিয়েছে রাশেদ।               

অবশ্য প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দে মিনিট খানেকের ভেতরই জেগে উঠল সে। কিন্তু ধাতস্ত হবার আগেই টের পেলো, বিং বিং শব্দ করে এলোপাথাড়ি বুলেট উড়ে যাচ্ছে ঠিক তার মাথার উপর দিয়েই। নিজের মাথার উপর দিয়ে বুলেট উড়ে যাবার অভিজ্ঞতা তার এই প্রথম! চারপাশে কী ঘটছে বোঝার চেষ্টা করল সে, কিন্তু মাথা একেবারেই কাজ করছে না তার। দম নিতেও কষ্ট হচ্ছে ভীষণ, অথচ মাথাটা পরিস্কার করতে এই মুহুর্তে বুকভরা অক্সিজেন চাই তার। দম নেবার জন্য মুখ হা করতেই একগাদা বালি দিয়ে মুখ ভরে উঠল; সেই সাথে অসহ্য যন্ত্রণায় ফের জ্ঞান হারাবার উপক্রম হলো। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে জাগিয়ে রাখবার চেষ্টা করল সে; কিন্তু দাঁতের চাপে মুখের ভেতরে বালি ভাঙ্গার কচকচ শব্দে ভীষণভাবে গা গুলিয়ে উঠল তার।

অগত্যা খুব ধীরে শ্বাস নিতে নিতে নিজের দিকে মনোযোগ দেবার চেষ্টা করল রাশেদ। ডান হাতটা ঠিক কাঁধের কাছ থেকে অসার হয়ে আছে; সম্ভবত কলারবোন ভেঙ্গেছে। হেলমেট থাকায় মাথাটা রক্ষা পেয়েছে বটে কিন্তু ভারী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের চাপে ডান পাঁজরের বেশ কয়েকটা হাড় সম্ভবত গুড়িয়ে গেছে। হেলমেটটা মাথা থেকে পিছলে মুখের উপর নেমে আসায় সামনের কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা সে, তবে পরিস্কার বুঝতে পারছে যে পাথরের খাঁজে কোথাও নিজের বাম পা বুট সহ গোড়ালির কাছে আটকে আছে। ফলে বিশ্রীভাবে মুচড়ে আছে বাম হাঁটুটা; বেকায়দা চাপ পরলেই মট করে ভেঙ্গে যাবে। তবে স্বস্তির কথা হচ্ছে, এখন যেভাবে প্রায় বালিচাপা অবস্থায় পরে আছে সে, তাতে এমনিতেও নড়াচড়ার কোনো সুযোগই নেই তার।

গোলাগুলিতে হঠাৎ খানিকটা ভাটা পরতেই পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল রাশেদ। আফ্রিকার দেশ মালিতে শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশী  কন্টিনজেন্ট ‘ব্যানব্যাট’ এর একজন শান্তিরক্ষী দোভাষী সে। সাহারা মরুভূমির পাশে গাও নামক দুর্গম আর প্রত্যন্ত এক এলাকায় তাদের বেইজ ক্যাম্প। জাতিসংঘের একটি লজিস্টিক কনভয়কে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ওরা। বনি নামের প্রত্যন্ত এক শহরে তাদের গন্তব্য। সেখানে লজিস্টিক পৌছে দিতে গত চারদিন আগে নিজেদের বেইজক্যাম্প থেকে বেরিয়েছিল ওরা। গাও থেকে বনির দূরত্ব প্রায় তিনশো কিলোমিটার। মরুভূমির ভেতর দিয়ে রাস্তার ষোল আনাই কাঁচা; তার উপর পদে পদে টেররিস্টদের চোরাগুপ্তা হামলার ভয়। তাই রয়ে সয়ে যেতে যেতে পাক্কা তিনদিন লেগেছে বনি পৌঁছুতে। কাজ শেষে আজ সকালেই ফিরতি কনভয় নিয়ে রওয়ানা দিয়েছিল ওরা। ফিরতি কনভয়ের সাথে ভারী কোনো গাড়ী না থাকায় বেশ দ্রুতই এগুতে পারছিল। টানা এগিয়ে দুপুর নাগাদ প্রায় দেড়শো কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছিল। সামনেই গসি নামের একটি গ্রাম আছে। ওখানে পৌছেই দুপুরের খাবারের বিরতি দেবার পরিকল্পনা করেছিল ওদের পেট্রোল কমান্ডার মেজর সাইরাস।

তিনশো কিলোমিটার রাস্তার প্রায় পুরোটাই লালচে আর কালচে বালিপাথরের ভেতর দিয়ে চলা মরুপথ; ইংরেজিতে একে বলে রেগস। সাহারা মরুর প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই এই রেগস দিয়ে ভরা; বাকি সিকিভাগ মিহিবালুর সাগর আর ক্ষয়ে যাওয়া উচুনিচু পাথরের জংগল, স্থানীয় নাম হামাদা। গসি পৌছুবার আগে বেশ বড়সরো একটি হামাদা পেরুতে হয়। রাস্তার এই অংশটি বরাবরই ঝুঁকিপূর্ন। এর আগেও বেশ কয়েকবার এখানটায় সামরিক-বেসামরিক কনভয় আর কাফেলার উপর এম্বুশ করেছে সন্ত্রাসীরা। মোক্ষম সময়ে পাথরের আড়াল থেকে ঘোড়া অথবা উট হাঁকিয়ে বেরিয়ে এসে কনভয় আর কাফেলার উপর আচমকা হামলে পরে তারা। তারপর লুটপাট শেষে আবার হারিয়ে যায় হামাদার ওপারের দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমিতে।

পেট্রল কমান্ডার হিসেবে মেজর সাইরাসের মত পেশাদার অফিসার আর দেখেনি রাশেদ; কথা খুব কম বললেও ড্রিল আর স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর পালনে এক চুল ছাড় দিতে নারাজ তিনি। বনি যাবার পথে গসি পেরুবার পরপরই মেজর সাইরাস বারবার ড্রোন উড়িয়েছেন; নিরাপদ দূরত্বে থেকেই ড্রোনের সহায়তায় হামাদার আশেপাশের এলাকা তন্ন তন্ন করে খুঁজে নিয়ে তারপর কনভয় সামনে বাড়িয়েছেন। কনভয়ের সাথের চারটা আর্মার্ড পার্সোনাল ক্যারিয়ারই ওদের মূল ভরসা; সংক্ষেপে ওরা এগুলোকে এপিসি নামেই ডাকে। আট চাকা বিশিষ্ট বিটিআর-৮০ মডেলের রাশিয়ান এই এপিসির দেয়াল দারুন শক্ত; স্মল আর্মসের গুলি তো বটেই এমনকি রকেট লঞ্চারের গোলাও রুখে দিতে পারে। তাছাড়া এম্ফিবিয়াস হবার কারনে ছোটখাটো নদীনালা অনায়েসে নৌকার মতই ভেসে পার হয়ে যেতে পারে। চওড়া আর পুরু চাকাগুলোর একেকটি বেশ কয়েক প্রস্থ বুলেট হজম করে ফেলতে পারে আর আট চাকা বিশিষ্ট হওয়ায় কোনো একটি চাকা পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেলেও অন্য চাকাগুলোর সাহায্যে দিব্যি একশো কিলোমিটার পাড়ি দিতে সক্ষম। সর্বোপরি, উপরে কো এক্সিয়ালে লাগানো জোড়া মেশিনগান আর ছয়টি স্মোক গ্রেনেড লঞ্চারের কল্যানে এর ফায়ার পাওয়ারও শান্তিরক্ষায় ব্যবহৃত যেকোনো সামরিক যানবাহনের চেয়ে ঢের বেশি। সেকারনেই কনভয়ের সামনে আর পেছনে দুটো করে এপিসি রেখে ওরা পথ চলে।

ফেরার পথেও মেজর সাইরাস ড্রোন উড়িয়ে হামাদা এলাকাটি সার্চ করিয়েছিল। কিন্তু সন্দেহজনক কিছু তার নজরে পরেনি। সবার সামনের লিড এপিসির কমান্ডার আছেন ওয়ারেন্ট অফিসার মকবুল। সুঠামদেহী এই জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও) ন্যাশনাল টিমের হকি খেলোয়ার ছিলেন একসময়। যেমন তার সাহস তেমনি তার রিফ্লেক্স; চোখ দুটো শকুনের মত তীক্ষ্ণ আর কান দুটো খরগোশের মত খাড়া। সেকারনেই মেজর সাইরাসের ফোর্স প্রোটেশন পেট্রোলের লিড এপিসিতে বরাবর তিনিই কমান্ডার হিসেবে থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী মেজর সাইরাস থাকেন দ্বিতীয় এপিসিতে। কনভয়ের পেছনের প্রথম এপিসিতে আছেন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার সোলায়মান আর সবার শেষ এপিসিতে পেট্রোল টু আইসি (উপ অধিনায়ক) হিসেবে আছেন ক্যাপ্টেন আমিন।

দুই বছরের চুক্তিতে ব্যানব্যাটের সাথে দোভাষী হিসেবে গতবছর যোগ দিয়েছিল রাশেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গনিতে মাস্টার্স করার পাশাপাশি অলিয়াস ফ্রাসেস থেকে ফ্রেঞ্চ ভাষাটা সে শিখেছিল শখের বসে। মাদ্রাসার ছাত্র হবার কারনে আরবী ভাষাটাও সহজেই শিখে নিয়েছিল তিনমাসের আরেকটা কোর্সে ভর্তি হয়ে। সেনাবাহিনীতে দোভাষী হিসেবে পরীক্ষা দিতে এসে একইসাথে দুটো ভাষার উপর দখলের সুবাদে সহজেই নির্বাচিত হতে পেরেছিল সে।

ব্যানব্যাটের প্রত্যেক পেট্রোলের সাথে পালা করে একজন দোভাষীকে যেতে হয়। বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের ইউনিফর্মই পরিধান করে ওরা, আর কাঁধে পরিধান করে ক্যাপ্টেনদের র‍্যাঙ্ক ব্যাজ। দোভাষীরা সাধারনত পেট্রোল কমান্ডারের এপিসিতেই যাতায়ত করলেও গত একবছরের বেশি সময় ধরে মালিতে থাকার সুবাদে ইদানীং রাশেদ লিড এপিসিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। কারন একবছরের রোটেশন শেষে আগের ব্যানব্যাটের সবাই চলে যাবার পর নতুন আসা ব্যানব্যাট শান্তিরক্ষীদের চেয়ে মালির আঞ্চলিক ভাষা, রাস্তাঘাট আর মানুষ চেনায় অনেক বেশি অভিজ্ঞ সে।

আজো লিড এপিসিতেই বসেছিল সে। এপিসির ভেতর আটজন সশস্ত্র সৈন্য অনায়াসে বসতে পারে। কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা সব গিয়ারস পরে অস্ত্র হাতে এভাবে মুখোমুখি বসে থাকাটা সত্যি কষ্টকর। সেকারনেই ওয়ারেন্ট অফিসার মকবুলকে সে অনুরোধ করেছিল ভেতরে এসে বসতে, যেন গসি পর্যন্ত রাস্তাটুকু এপিসির বাইরে গলা বের করে বাতাস খেতে খতে যাওয়া যায়। লিড এপিসিতে বসার এই এক সুবিধা, কনভয় এগিয়ে চলে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে, কিন্তু লিড এপিসির অবস্থান সবার সামনে হওয়ায়, একমাত্র এই এপিসিটিই থাকে ধুলোর মেঘের বাইরে।

কিন্তু বিধিবাম! রাশেদ এখন নিশ্চিত যে রাস্তায় বোমা পাতা ছিল। এই বোমার কেতাবী নাম ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস; সংক্ষেপে বলে আইইডি। স্থানীয় প্রযুক্তিতে বানানো এই বোমা সত্যি ভয়ঙ্কর! গুলি করে এপিসির চামড়া ভেদ করা অসম্ভব হলেও রাস্তায় পাতানো আইইডি বিস্ফোরণের আঘাত সহ্য করার সাধ্য কোনো এপিসিরই নেই। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ফেলল রাশেদ। ওদের লিড এপিসি আইইডিতে আঘাত করা মাত্র বিস্ফোরণটি ঘটে এবং ঠিক সেই মুহুর্তে সে পা ঝুলিয়ে এপিসির উপর বসা ছিল। বিস্ফোরণের ধাক্কায় সে ছিটকে রাস্তার একপাশে এসে পড়েছে; পরক্ষণেই এপিসির ভেতরে বসা বাকিদের কথা মনে পরতেই আঁতকে উঠল রাশেদ!

হঠাৎ করেই গোলাগুলির মাত্রা ফের বহুগুনে বেড়ে গেল। রাশেদ টের পাচ্ছে যে ওর ডান পাশ থেকে আসা গুলির তোড়ে বাম পাশের গুলির আওয়াজ ক্রমশ ক্ষীণ হতে শুরু করেছে। ব্যানব্যাটের মেশিনগানের চেনা আওয়াজ শুনে সে বুঝল, ব্যানব্যাটের শান্তিরক্ষীরা তার ডানেই আছে। তারমানে সে এপিসি থেকে ছিটকে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে চলা রাস্তার দক্ষিনে এসে পড়েছে। এর আরেকটি মানে হলো, সন্ত্রাসীরা হামাদার আড়াল থেকে নয় বরং তারা রাস্তার উল্টাপাশের বালিয়াড়িতে গা ঢাকা দিয়ে ছিল আর সেখান থেকেই আক্রমণ করেছে।  আর এই মুহুর্তে সে ব্যানব্যাট আর সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঠিক মাঝখানে কোথাও শুয়ে আছে। এখন মাথা তুলতে যাওয়ার মানে নিজের মরন ডেকে আনা। হয়তবা নিজেদের মেশিনগানের গুলিতেই মাথাটা ছাতু হয়ে যেতে পারে। কিন্ত তারচেয়েও বড় বাস্তবতা হলো চেষ্টা করেও সে নিজের শরীরের কোনো পেশি নাড়াতে পারছেনা এই মুহুর্তে।

আচমকা গুলির আওয়াজ সম্পুর্ন বন্ধ হয়ে যেতেই ব্যানব্যাটের লোকদের কন্ঠ ভেসে এলো রাশেদের কানে। বাংলায় ওদের আহাজারি শুনে সে আঁচ করতে পারল যে লিড এপিসির কেউই হয়ত আর বেঁচে নেই। ‘বাঁচাও!’ বলে প্রানপনে চিৎকার করল রাশেদ কিন্তু তার গলা থেকে হালকা গোঙ্গানোর আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দই বেরুলো না। হঠাৎ একরাশ আতঙ্ক গ্রাস করতে শুরু করল রাশেদকে। সে কি মারা যাচ্ছে? ও মারা যাবার আগে ব্যানব্যাটের ওরা কি ওকে খুঁজে পাবে? এতক্ষনের উত্তেজনা শেষে রাশেদের সারা দেহের যন্ত্রণা যেন একসাথে শুরু হলো। সব যন্ত্রণা উপেক্ষা করে সর্বশক্তি দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল সে। কিন্তু দেহের উপর জমে থাকা মাটির ওজন আর নিজের সদ্য আঘাতপ্রাপ্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অসহযোগিতার কারনে লাভের লাভ হলো না কোনো; স্রেফ আরেক দফা ব্যথার স্রোত অসার করে দিল তাকে। আরো একবার অসহায়ের মত সংজ্ঞা হারালো রাশেদ।

***

ঠিক কতক্ষণ পর আবার তার জ্ঞান ফিরল, তা বুঝতে পারল না রাশেদ। তীব্র ব্যথায় নিজের অনুভূতি সব ভোঁতা লাগল তার কাছে। তৃষ্ণায় গলা-বুক সব ফেটে যাচ্ছে যেন। শক্তি খাটিয়ে লাভ নেই বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে ডানেবামে মাথা নাড়তে শুরু করল সে। কোনো রকমে মুখের উপর থেকে হেলমেটটা একপাশে সরে যেতেই দিনের আলোয় তার চোখ ধাধিয়ে গেল। পিট পিট করে দৃষ্টি পরিস্কার করতেই মালির মেঘহীন নীল আকাশ চোখের সামনে ভেসে উঠল। সুর্য বেশ আগেই মাথার উপর থেকে নেমে গিয়ে পশ্চিমে হেলে পড়েছে। হঠাৎ সামনের নীল আকাশে একটা ছোট্ট সাদা বিন্দুকে ক্রমশ বড় হতে দেখতে পেল রাশেদ। দেখতে দেখতে বিন্দুটা একটি সাদা হেলিকপ্টারে রূপ নিল, সেই সাথে হেলিকপ্টার রোটরের ভোঁতা ভট ভট শব্দ কানে ভেসে এলো। গুরুতর আহতদের দ্রুত সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে নিশ্চয় মেজর সাইরাস হেলিকপ্টার চেয়ে পাঠিয়েছেন। তীব্র যন্ত্রনার মাঝেও একরাশ সুখানুভূতিতে আচ্ছন্ন বোধ করল রাশেদ। ক্লান্তি আর তৃষ্ণায় তার চোখ দুটো আপনাআপনি বুজে এলো।

হেলিকপ্টার উড়ে যাবার শব্দে ফের সংবিত ফিরে পেলো রাশেদ। মানে কী! ওকে ফেলেই হেলিকপ্টার চলে যাচ্ছে কী করে? ছটফট করে উঠল সে, কিন্তু যথারীতি তার দেহ কোনো সাড়াই দিল না। বরং যাবার পথে হেলিকপ্টার রোটরের বাতাসে আরেক প্রস্থ মিহি বালি ছড়িয়ে পরল তার নাকে মুখে। হেলিকপ্টারের আওয়াজ ফিকে হতে না হতেই এপিসিগুলোর ইঞ্জিনের গর্জন পরিস্কার শুনতে পেল রাশেদ। ওরাও কি চলে যাচ্ছে? হঠাৎ একরাশ অসহায়ত্ব আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল তাকে; প্রচন্ড হতাশায় কান্না পেলো তার। ব্যানব্যাটের কেউ ওকে খুঁজে পায়নি। ওরা হয়ত কোনো কারনে ধরেই নিয়েছে যে সে আর বেঁচে নেই। তাই বলে কি তার মৃতদেহটিও খুঁজে দেখার গরজ করবেনা ওরা? মেজর সাইরাস তো প্রায়ই বলতেন, যোদ্ধারা নাকি কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে সহযোদ্ধাদের মৃতদেহটি পর্যন্ত ফেলে রেখে যায় না। তাহলে ওর সাথে কেন এমন করল ওরা? আজ দোভাষী না হয়ে যদি সে ওদের মতই নিয়মিত কোনো সৈনিক কিংবা অফিসার হতো, তাহলেও কী ওরা তার সাথে এমন আচরন করত? কিংবা এমনটা করার কথা ভাবতেও কী পারত? এসব কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ করে রাশেদের দু চোখ বেয়ে নেমে এল অভিমানী অশ্রুধারা। এতক্ষনের অসহ্য ব্যথায় যে রাশেদ একটি বারের জন্যও কাঁদেনি, সেই রাশেদই এবার নিস্ফল আক্রোশ আর অভিমানে হু হু করে কেঁদে ফেলল।

হঠাৎ কয়েক জোড়া এলোমেলো পায়ের শব্দে সচকিত হলো রাশেদ। অশ্রুভেজা ঘোলা দৃষ্টিতে সে তিনজন শান্তিরক্ষীকে নালার ঢাল বেয়ে সন্তর্পনে নেমে আসতে দেখল। ওদের পেছনে পশ্চিমাকাশে ঢলে পরা সূর্যের প্রখরতার কারনে কারো চেহারাই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেনা সে। তবে কয়েক মুহুর্ত আগেই সে যা ভাবছিল, তা মনে করে ভীষণ লজ্জিত বোধ করল রাশেদ। ছি! কিভাবে এমন করে ভাবতে পারল সে? সত্যি তাহলে যোদ্ধারা কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সহযোদ্ধাদের ফেলে রেখে যায় না! মেজর সাইরাসের প্রতি একরাশ অব্যক্ত কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত বোধ করল সে। শান্তিরক্ষী তিনজন দ্রুত হাত চালিয়ে তার গা থেকে মাটি-বালি সরিয়ে তাকে বের করে আনল। মাটির চাপে এতক্ষণ ক্ষতস্থানগুলোর ব্যথাও চাপা পরে ছিল। মুক্ত হতেই একযোগে সারা শরীরের ব্যথায় ফের কাতর বোধ করল সে। তারপরও নিজের উদ্ধারকারীদের চেহারাগুলো দেখবার অদম্য বাসনা তাকে জাগিয়ে রাখল। কিন্তু দৃষ্টি সামান্য পরিস্কার হতেই সামনে যা দেখল তাতে রক্ত হিম হয়ে এল রাশেদের!

এতক্ষণ যাদের সে ব্যানব্যাটের শান্তিরক্ষী বলে ভাবছিল, তাদের পরনে সামরিক বাহিনীর ইউনিফর্ম থাকলেও মাথার নীল পাগড়ি আর পাগড়ির বাড়তি অংশ দিয়ে নেকাবের মত করে নাক-মুখ ঢেকে রাখা! দেখামাত্র রাশেদ নির্ভুলভাবে ওদের তুয়ারেগ বেদুঈন বলে চিনতে পারল! এখন সে নিশ্চিত যে এরাই কিছুক্ষণ আগে ওদের কনভয়ের উপর এম্বুশ করেছিল।

হঠাৎ ওদের মধ্যে কম বয়েসি একজন উন্মত্ত ষাড়ের মত ক্ষেপে গিয়ে উদ্যত ড্যগার হাতে তেড়ে এসে মাটিতে পরে থাকা রাশেদের বুকের উপর চেপে বসল। পড়ন্ত বিকেলের রোদে তার মাথার উপর ধরা তুয়ারেগ ড্যাগারের ফলা ঝিকমিকিয়ে উঠল। দুহাতে ড্যাগারের বাট শক্ত করে চেপে ধরে রাশেদের বুকে এমনভাবে ড্যাগার চালাতে লাগল যেন মোরব্বা বানাতে চাইছে। যদিও বুলেট প্রুফ ভেস্টের কারনে রাশেদের দেহে ড্যাগারের কোনো আঘাতই পৌঁছুতে পারছে না, কিন্তু তুয়ারেগ যুবক ব্যাপারটি ধরতে পারছে কিনা তা বোঝার উপায় নেই। সহসাই পাশে দাঁড়ানো অপেক্ষাকৃত নেতা গোছের লোকটি স্থানীয় তামাশেক ভাষায় ‘থামো’ বলে ধমকে উঠে রাশেদের উপর চেপে বসা খুনে যুবককে টেনে হিচড়ে নামিয়ে নিল। কিন্তু রাগে দিশেহারা যুবকটি ফের রাশেদের দিকে তেড়ে আসতে নিতেই নেতা গোছের লোকটি এবার বিদ্যুৎ গতিতে নিজের কোমরে ঝোলানো খাপ থেকে তরবারি বের করে সেই যুবকের চিবুকের নিচে ধরল; দুচোখে একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে যুবক তার দিকে তাক করা তুয়ারেগদের ঐতিহ্যবাহী তাকোবা তরবারির ফলার দিকে চোখ রেখে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। তারপর হিংস্র গলায় হিসহিসিয়ে বলল, ‘কিছুক্ষণ আগে এর সাথীদের হাতেই আমাদের তিনজন জিহাদি ভাই মারা গেছে…’

কিন্তু তার কথা শেষ হবার আগেই এবার বয়স্ক তৃতীয় ব্যক্তিটি কথা বলে উঠল, ‘আমাদের চেয়ে কিন্তু ওদের লোকই বেশি মারা গেছে আজকের লড়াইয়ে। এখন একে এখানেই মেরে ফেলা যায়; কিন্তু ভুলে গেলে চলবেনা যে মরুভূমিতে মরা উটের চেয়ে জীবিত উটের দাম সবসময়ই বেশি।’ 

তার কথায় মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে তাকোবাটি নামিয়ে নিয়ে কোমরের খাপে ফেরত পাঠালো ওদের নেতা। তারপর কর্তৃত্বভরা কন্ঠে বলল, ‘একে সাথে নিয়ে চলো। দেখা যাক, যদি এর বিনিময়ে কিছু পাওয়া যায় কিনা, আর যদি না পাই, তাহলে তখন মেরে ফেললেই হবে। কাজ শেষে ওর ইউনিফর্ম আর বুট জোড়া তোমার, এবার খুশি তো?’দোভাষী হিসেবে তামাশেক ভাষা রাশেদ বোঝে আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা বলতেও পারে। তাই কথোপকথনের শেষ অংশটুকু শুনে সে শিউরে উঠল। দোভাষী হিসেবে স্থানীয়দের বিভিন্ন সমস্যার শান্তিপূর্ন মিমাংশা করে দিতে অসংখ্যবার সে আপোষরফার আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। এবার নিজের প্রাণ বাঁচাতে ওদের সাথে আপোষরফার আলোচনা শুরু করার কথা ভেবে মুখ খুলতে উদ্যত হতেই তৃতীয় তুয়ারেগ বেদুঈনটি আচমকা রাশেদের মাথা বরাবর নিজের অস্ত্রের বাট চালাল। একে-৪৭ সাব-মেশিনগানের কাঠের বাটের আঘাতে মুখের ভেতর নিজের রক্তের নোনা স্বাদ টের পেলো রাশেদ, তারপর ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল তার জগতে;  জ্ঞান হারিয়ে নিস্তার পেল সে। কিন্তু কল্পনাও করতে পারলো না, সামনে কী অসহনীয় ভোগান্তি অপেক্ষা করছে তার জন্য!

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

6 thoughts on “মিশন তিম্বক্তু (এক)”

  1. কাজী আনোয়ার হোসেনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি, স্যার।
    দুই তিন ঘন্টা পর পর আপলোড দেন।
    অপেক্ষা মৃত্যুর চেয়েও কস্টকর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *