Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় ১১

ব্যানব্যাট ব্রিফিং রুম, গাও সুপারক্যাম্প, মালি

জেনারেল ফিলিপ সরু চোখে ব্যানব্যাটের সিসি কর্নেল আজাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।

গত পরশু দিনের ঘটনায় ব্যানব্যাটের কিছু শান্তিরক্ষী মারা যাওয়ায় মালিতে নিয়োজিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের ফোর্স কমান্ডার হিসেবে ব্যানব্যাট কন্টিনজেন্ট পরিদর্শনে আসাটা এমনিতেই তার কর্তব্যের মধ্যে পরে। উপরন্তু একজন শান্তিরক্ষী টেররিস্টদের হাতে জিম্মি হয়েছে মর্মে ব্যানব্যাটের দাবির সত্যতা নিশ্চিত করাও তার জন্য বেশ জরুরী। কারন মালিতে শান্তিরক্ষীদের হতাহতের হার বিশ্বের যেকোনো শান্তিরক্ষা মিশনের চেয়ে বহুগুন বেশি। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে লেবাননে চলমান শান্তিরক্ষা মিশনে আজ অবধি মারা গেছে ৩১৩ জন শান্তিরক্ষী, যা জাতি সংঘের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অথচ ২০১৩ সালে শুরু হওয়া মালির এই শান্তিরক্ষা মিশন (মিনুসমা) তে ইতোমধ্যে ১৯১ জন শান্তিরক্ষী হারিয়েছে তারা।

ফোর্স কমান্ডার, সেক্টর কমান্ডার আর ব্যানব্যাটের সিসির উপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার উপর সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং এইমাত্র শেষ হলো। ব্রিফিং এর শেষে যথারীতি শান্তিরক্ষা অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য, বোম্ব ডিসপোজাল উপকরণ আর এয়ার সাপোর্টের অভাবের কথা আবারো উচ্চারিত হলো। জেনারেল ফিলিপের কাছে এই ব্যাপারগুলো ক্রমশ গৎবাঁধা হয়ে উঠছে। ইউরোপিয়ান একজন জেনারেল হিসেবে ন্যাটো বাহিনীর অভিযান আর জাতিসংঘ বাহিনীর অভিযানের পার্থক্য তিনি ভাল করেই বোঝেন। একই সাথে বোঝেন যে শান্তিরক্ষা অভিযানে এসব অভাব খুব সহসাই মিটবার নয়। সব কয়টি জাতিসংঘ মিশনই এমন সব সীমাবদ্ধতা নিয়েই চলছে, তবে তার ব্যক্তিগত ধারনা, মালিতে এভাবে চলা কঠিন হবে। কারন অন্যান্য মিশন এলাকায় শান্তিরক্ষীরা স্থানীয়দের সহানুভূতি পেয়ে থাকে; একমাত্র মালিতেই পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে শান্তিরক্ষীদের হত্যার প্রবনতা দেখা যাচ্ছে। আর একারনেই মালিতে শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা এক অতীব গুরুত্বপূর্ন ইস্যু।

কিন্তু অজ্ঞাত টেররিস্টরা ব্যানব্যাটের একজন শান্তিরক্ষীকে জিম্মি করে নিয়ে গেছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, যথেষ্ট তথ্য প্রমান ছাড়া তা মেনে নেয়াটা জেনারেল ফিলিপের জন্য কঠিন। আজ ব্যানব্যাট পরিদর্শনে আসবার আগে মালিতে মোতায়েন ফ্রেঞ্চ ফোর্সের কমান্ডারের সাথেও তার কথা হয়েছে। সঙ্গতকারনেই মালিতে চলমান শান্তিরক্ষা মিশনের যেকোনো কর্মকান্ডে ফ্রেঞ্চদের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। ফ্রেঞ্চ ফোর্স কমান্ডারের মতে, আপাতদৃষ্টিতে ব্যানব্যাটের দাবী যৌক্তিক হলেও এখনও যেহেতু কেউ শান্তিরক্ষী অপহরনের দায় স্বীকার করেনি অথবা জিম্মির বিনিময়ে কিছু দাবী করেনি, তাই মুহুর্তে ব্যাপারটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়ার ইচ্ছে তার নেই। জেনারেল ফিলিপেরও একই ইচ্ছে। তাছাড়া মালির মত এমন উত্তপ্ত আভিযানিক এলাকায় এসব লেগেই আছে। যুদ্ধ মানেই তো সৈন্যক্ষয়। তাই শান্তিরক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে এমন কিছু শান্তিরক্ষী সৈন্যক্ষয় মেনে নেয়া ছাড়া উপায় কই?

জুসের গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে কর্নেল আজাদের দিকে তাকিয়ে জেনারেল ফিলিপ শুরু করলেন, ‘আই এম রিয়েলি সো সরি ফর ইয়োর লস, কর্নেল আজাদ। একসাথে ছয়জন শান্তিরক্ষী হারানো নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য ভীষণ কষ্টের।’

‘পাঁচ জন, স্যার।’ দৃঢ় কন্ঠে শুধরে দেন কর্নেল আজাদ।

‘ওয়েল, আই কারেক্ট মাই সেলফ। তবে একজনের জিম্মি হবার ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে সঠিক বলে মনে হলেও আমাদের আরো নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন আছে। আমি অলরেডি এলাকায় কম্বিং অপারেশন চালানোর নির্দেশ দিয়েছি; বুরকিনা ফাসো ব্যাটালিয়ন ব্যাপারটা দেখছে। তোমরা চাইলে ওদের আরো তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারো।’

‘নিশ্চয়, জেনারেল।’

‘কর্নেল, শান্তিরক্ষা বেশ জটিল অভিযান। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারনে তোমাদের চেয়ে সেটা আর কে ভালো বুঝবে। গত ত্রিশ বছরে বিভিন্ন মিশনে তোমরা ইতোমধ্যেই শতাধিক শান্তিরক্ষী হারিয়েছো। তোমাদের সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির জন্য আমি ফোর্স কমান্ডার হিসেবে আর ব্যক্তিগতভাবেও গভীরভাবে মর্মাহত। মৃতদেহের সাথে আমি আমার ডেপুটিকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছি যেন সবাই এই ত্যাগের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে। নিহত আর আহত শান্তিরক্ষীদের জন্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে নিয়ম অনুযায়ী সবই করা হচ্ছে এবং হবে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমরা সবাই এখানে পেশাদার সৈনিক এবং একটি আভিযানিক এলাকায় আছি। শান্তিরক্ষা আধুনিক প্রজন্মের যুদ্ধ, আর যুদ্ধে তো প্রাণহানি হবেই, কর্নেল।’

‘ইয়েস, জেনারেল।’

‘আমি চাই যত দ্রুত সম্ভব তোমরা এই শোক কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে,’ বিদায়ী হ্যান্ডশেক করতে করতে বললেন জেনারেল, ‘নিহতদের বদলে নতুন সৈন্য আনার ব্যবস্থা করবে এবং মালিতে শান্তিরক্ষা অভিযানের সাফল্য নিশ্চিত করতে তোমাদের কন্টিনজেন্টের কার্যক্রম অব্যহত রাখবে।’

‘নিশ্চয়, জেনারেল। ক্যাপ্টেন রাশেদকে উদ্ধারের ব্যাপারে আমরা ফোর্স কমান্ডার হিসেবে আপনার সহযোগীতা কামনা করছি।’

‘নিশ্চয়, আজাদ,’ চেহারায় সিরিয়াস ভাবটি অটুট রেখে স্টাফ কারের জানালার কাঁচ নামিয়ে জবাব দিলেন জেনারেল, ‘কম্বিং অপারেশন তো চলছে। মিনুসমা তার সর্বোচ্চ চেস্টাই করবে, কথা দিচ্ছি।’কিন্তু ব্যানব্যাট কম্পাউন্ড ছাড়িয়ে জেনারেল ফিলিপের স্টাফ কারটি গাও এয়ারপোর্টের দিকে ধেয়ে চলতে শুরু করতেই তিনি গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে ভাবলেন, ব্যানব্যাটের ক্যাপ্টেন যদি সত্যি কোনো টেররিস্ট গ্রুপের হাতে জিম্মি হয়ে থাকে, তাহলে আসলেই কি তাকে উদ্ধারে মিনুসমার খুব বেশি কিছু করার আছে? বিশেষত ফ্রেঞ্চ ফোর্সের এমন অনীহার মুখে?

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

3 thoughts on “মিশন তিম্বক্তু (এগার)”

  1. Pingback: মিশন তিম্বক্তু (দশ) – Delwar Hossain Khan

  2. Mahbubur rahman

    আমি তিম্বুক্তি সব পর্ব এক সাথে পাবো কোথায়

    1. এখনো তো লিখছি। এই মুহুর্তে একসাথে পাওয়া যাবে আমার মাথায়, সিরিয়াসলি। হ্যাভ পেশেন্স এন্ড হ্যাপি রিডিং, ব্রো!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *