Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় ৪

ওভারসীজ অপারেশন্স পরিদপ্তর, সেনা সদর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বাংলাদেশ

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পূর্ব পাকিস্তানে একটি নতুন কম্যান্ড গঠন করা হয় এবং এই কমান্ডের প্রথম জিওসি জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের তত্বাবধানে ঢাকায় অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে সেনা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্প্রসারণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেনা সদর দপ্তরের কলেবরও বাড়তে থাকে। বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের মূল সড়ক শহীদ সরণীর পূর্ব পাশে অবস্থিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক সদর দপ্তর হিসেবে স্বীকৃত। এই সদর দপ্তরের পুরোভাগে নবনির্মিত হেলমেট সদৃশ ডিজাইন গুরুত্বপূর্ন এই স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে যোগ করেছে অনন্য এক মাত্রা।

স্বাধীনতার পর থেকে সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন সমুহ সেনা সদরের মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহনের কলেবর বেড়ে যাবার পর মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরের উপর কাজের চাপ কমাতে ২০০৬ সালে ওভারসিজ অপারেশন্স ডাইরক্টরেট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতিসংঘ মিশনসহ সেনাবাহিনীর সকল প্রকার আন্তর্জাতিক অপারেশন সমুহ এই ডাইরেক্টরের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছে।  

নিজের ডেস্কে বসে হাতের মোবাইলটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেজর ইশরাক। ওভারসীজ অপারেশন্সের পার্সোন্যাল সেকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে এই কাজটি তারই করবার কথা। কিন্তু প্রত্যেকবারই এই জাতীয় কাজ করবার আগে নিদারুন মর্মপীড়ায় ভোগে সে আর ভাবে, তার হয়ে কাজটি অন্যকেউ যদি করে দিত!

উত্তেজনা প্রশমন করতে আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে ফেলল ইশরাক, তারপর সামনের তালিকাটায় আরেকবার চোখ বুলালো; প্রথমে ছয়টি নাম, পরে আরো দুটো; প্রত্যেকটি নামের পাশে একজন নিকটাত্মীয়ের নাম আর তার মোবাইল নম্বর টাইপ করা। আধ খাওয়া সিগারেটটা এশট্রেতে গুঁজে দিয়ে প্রথম নম্বরটি মোবাইলে টাইপ করতে শুরু করল ইশরাক। টাইপ করতে করতেই ভাবল, মৃত্যু মানুষের নিশ্চিত এক ভবিতব্য, তবু নিকটজনের মৃত্যুর সংবাদ একেক জন একেক ভাবে নেয়।

গত দুই বছরের অভিজ্ঞতায় সে শিখেছে, মৃতের পিতামাতা, স্ত্রী কিংবা সন্তানকে মৃত্যুর সংবাদটি সরাসরি দিতে নেই; তাতে কখনও কখনও প্রতিক্রিয়া আর ফলাফল হয় ভয়াবহ! বরং শুরুতেই মৃতের মামা-চাচা গোছের কাউকে ডেকে নিয়ে সময় নিয়ে সংবাদটি দিতে হয়, যেন সেই আত্মীয়টি উপযুক্তভবে এই চরম দুঃসংবাদটি তার পরিবারের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় আহতদের পরিবারকে বোঝাতে। যথেষ্ট সময় নিয়ে বুঝিয়ে বলার পরও তারা ধরেই নেয় যে তাদের পরিবারের কর্তাটি আর বেঁচে নেই এবং অফিস থেকে ব্যাপারটি ইচ্ছে করেই আপাতত গোপন করা হচ্ছে। এরপর বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে ফোনের পর ফোন আসতে শুরু করে; সবাই নিশ্চিত হতে চায় যে আহত ব্যক্তিটি সত্যি বেঁচে আছে কিনা।

ইতোমধ্যে ইশরাকের মোবাইল থেকে করা কলটি বাজতে শুরু করেছে। মোবাইলটি কানের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে সে অপেক্ষায় আছে। সম্ভাব্য কল রিসিভকারীর নাম মিসেস মেহনাজ অফরিন, সে মালিস্থ ব্যানব্যাট কন্টিনজেন্টের দোভাষী ক্যাপ্টেন রাশেদের স্ত্রী!   

***

সকাল সকাল খবরের চ্যানেলটি খুলে বসা রাহেলা বেগমের পুরনো অভ্যাস। অনেক রাত অবধি রাশেদের সাথে ইন্টারনেটে কথা বলে বৌ মা একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠে। তাই বাধ্য হয়েই রাহেলা বেগম টিভির সাউন্ড যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখেন।

‘…আফ্রিকার মালিতে আই ই ডি বিস্ফোরণে ছয় শান্তিরক্ষী নিহত, আহত দুই। নিহতরা হলেন…’ টিভি স্ক্রলে নিজের ছেলের নাম দেখে রাহেলা বেগম প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না; তারপর নিজের অজান্তেই ‘বৌ মা…’ বলে আর্ত চিৎকার করে জ্ঞান হারালেন। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা হতচকিত মেহনাজ চিৎকার শুনে আলুথালু বেশে ড্রয়িং রুমে পৌছে নিজের শাশুড়িকে সংজ্ঞাহীন পরে থাকতে দেখে দ্রুত তার দিকে ছুটে গেল।টিভি স্ক্রলটি অনবরত ডান থেকে বায়ে ধেয়ে চলেছে। সধবা মেহনাজের সদ্য বৈধব্যের সংবাদটি যখন ইথারে ছড়িয়ে পরছে সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে, তখন কিংকর্তব্যবিমুঢ় মেহনাজ উন্মুখ হয়ে রাহেলা বেগমের জ্ঞান ফেরাতে ব্যস্ত! ঠিক তখনই বেড রুমে রাখা তার মোবাইল ফোনটিও সুরেলা রিং টোনে বাজতে শুরু করল এবং বাজতেই থাকল। মোবাইল স্ক্রিনে কলার আইডিতে লেখা ‘ওভারসীজ ওপারেশন্স বাংলাদেশ আর্মি’; মিশনে যাবার আগে রাশেদ যত্ন করে এই নাম্বারটি মেহনাজের মোবাইলে সেভ করে গিয়েছিল।

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

1 thought on “মিশন তিম্বক্তু (চার)”

  1. Pingback: মিশন তিম্বক্তু (তিন) – Delwar Hossain Khan

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *