Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় ২৩

ফরাসী দূতাবাস
মাদানী এভেনিউ, ঢাকা, বাংলাদেশ

ফরাসী রাস্ট্রদূত কান থেকে ফোন নামিয়ে রেখে নিজের চেয়ারে হেলান দিলেন। এইমাত্র বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাদের অপহৃত শান্তিরক্ষীকে উদ্ধারের ব্যাপারে ফ্রান্সের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ভিডিওটি দেখবার পর অবশ্য এমনটাই আশা করেছিলেন তিনি। যেহেতু মালিতে জাতিসংঘ বাহিনীর পাশাপাশি ফরাসি সেনাবাহিনীও একই জায়গায় মোতায়েন আছে তাই বাংলাদেশ সরকার তাদের সহায়তা চাইতেই পারে বলে ধারনা করে তিনি আগেভাগেই তার সরকারের মতামত জেনে রেখেছিলেন। তাদের হাতে এই মুহুর্তে এ অপহৃত শান্তিরক্ষী সংক্রান্ত কোন তথ্য নেই আর জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী উদ্ধারের মামলায় তার দেশ বরং জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ আর নির্দেশনার অপেক্ষায়ই থাকবে বলে মনস্থ করেছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কল পাবার সাথেসাথেই নেতিবাচক কিছু বলাটা কূটনৈতিকভাবে শোভন আর সমীচীন ভাবলেন না তিনি। তাই বলেছেন যে, নিজের সরকারের সাথে যত দ্রুত সম্ভব কথা বলে জানাবেন।
হঠাৎই কূতনীতি নিয়ে হিটলারের সেই কথাটা তার মনে পরল, “যেখানটায় কূটনীতির ইতি, সেখানটায়ই যুদ্ধের শুরু!”
কেন কথাটা হঠাৎ মাথায় এলো তা ভেবে বিরক্ত বোধ করলেন তিনি। জোর করে কথাটা মাথা থেকে সরিয়ে বরং ভাবতে বসলেন দু ঘন্টা পর বাংলাদেশকে কি ভাষায় তার দেশের সিদ্ধান্তটি জানাবেন তিনি।

***

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বামাকো, মালি

বাংলাদেশে মালির কোনো দূতাবাস বা কনস্যুলেট নেই। ভারতের নয়াদিল্লীতে আছে সবচেয়ে কাছের মালিয়ান দূতাবাস। যদিও সেই দূতাবাসের কার্য পরিধি বেশ সীমিত। তবে মালির রাজধানী বামাকোর ফালাদি এলাকায় বাংলাদেশের একটি কনস্যুলেট আছে। মূলত মালিতে মোতায়েনরত কয়েক হাজার বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের সুবাদেই এই কনস্যুলেটটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখানকার অনারারি কনস্যুলেট মালিরই নাগরিক এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাকে সাথে নিয়ে কর্নেল আলতাফ মালির পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ওয়েটিং রুমে বসে আছেন মন্ত্রী মহোদয়ের সাক্ষাতের অপেক্ষায়। কর্নেল আলতাফ মালির জাতিসংঘ মিশনের একজন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী হিসেবে কর্মরত আছেন গত সাত মাস ধরে। মালিতে মোতায়েনরত সকল বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের ভেতর তিনিই জৈষ্ঠ্যতম বিধায় তাকে কান্ট্রি সিনিয়র হিসেবে গন্য করা হয়। বাংলাদেশ সেনাসদরের ওভারসীজ অপারেশন্স ডাইরেক্টরেটের নির্দেশেই তিনি এসেছেন ক্যাপ্টেন রাশেদকে উদ্ধারে মালি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করতে। 

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মন্ত্রী মহোদয়ের সাক্ষাৎ মিলল অবশেষে। মন্ত্রী হিসেবে তাকে বয়েসে বেশ তরুনই বলা চলে মালির পররাষ্ট্র মন্ত্রী মহদয়কে। তবে তিনি বেশ মনোযোগ দিয়ে তার সব কথা শুনলেন। 

‘আপনারা ঠিক কী ধরনের সাহায্য চাইছেন তা আমি নিশ্চিত নই? আপনিও জানেন যে, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে আমাদের সরকার বা সেনাবাহিনীর পূর্ন নিয়ন্ত্রন নেই। জাতিসংঘ আর ফ্রেঞ্চ ফোর্সই সব দেখভাল করছে এখন।’

‘আপনারা যদি অনুমতি দেন তাহলে আমাদের দেশ থেকে কমান্ডোরা এসে এখানে অপারেশন চালিয়ে ক্যাপ্টেন রাশেদকে উদ্ধারে আগ্রহী।’

‘অসম্ভব কর্নেল!’ প্রায় সাথে সাথে অসম্মতি জানালেন মন্ত্রী মহোদয়, আপনাদের অফিসারের জন্য আমাদের পূর্ন সহানুভূতি রেখেই বলছি এভাবে এক দেশের ভেতর অন্যদেশের সশস্ত্র বাহিনী প্রবেশ করে অভিযান পরিচালনার অনুমতি পৃথিবীর কোনো দেশই দেয় না। আপনাদের অবশ্যই জাতিসংঘ এবং ফ্রেঞ্চ ফোর্সের সাথে করা আমাদের চুক্তিকে সম্মান জানাতে হবে। আর তারা তাদের মিশন ম্যান্ডেটের মধ্যে থেকে যতটা করতে পারে তা নিয়েই আপনাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে। মালিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে তা যেন কোন ভাবেই ব্যহত না হয় তা নিশ্চিত করতে শান্তিরক্ষী সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আপনারাও তো অঙ্গীকারাবদ্ধ, তাই নয় কি?’ 

কর্নেল আলতাফ কথা বাড়াবার আর কোনো হেতু খুঁজে পেলেন না; একরাশ হতাশায় তার ফর্সা মুখ কালো দেখাচ্ছে।

***

ফ্রেঞ্চ মিলিটারি বেইজ
গাও, মালি

ফ্রেঞ্চ মিলিটারি বেইজের ফোর্স কমান্ডারের সাথে সংক্ষিপ্ত আলাপ শেষে ব্যানব্যাট এর কন্টিনজেন্ট কমান্ডার কর্নেল আজাদ উঠে দাঁড়ালেন। করমর্দনের সময় হাত না ছাড়িয়েই ফ্রেঞ্চ কমান্ডার আন্তরিক কন্ঠে বললেন, ‘কর্নেল, আমিও তোমার মতই একজন সৈনিক আর কমান্ডার। তোমার মানসিক অবস্থা আমি বুঝি। আমি আমার চ্যানেলে তোমার অনুরোধ আমার উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে নিশ্চয় জানাব আর ইতিবাচক সাড়া পাওয়া মাত্রই তোমাকে কল করব। আমি নিশ্চিত তুমি বুঝতে পারছ আমি কি বলছি।’

‘নিশ্চয়, কমান্ডার। আপনি জানেন আমি আপনার কলের অপেক্ষায় থাকব।’

***      

জাতিসংঘ সদর দপ্তর
ম্যানহাটান, নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ইস্ট নদীর পাশে প্রায় ১৮ একর জায়গার উপর জাতিসংঘ সদর দপ্তরটি অবস্থিত। জায়গাটিকে টার্টল বে নামেও অনেকেই চেনেন। সফল মার্কিন ব্যবসায়ী ও সাবেক উপরাষ্ট্রপতি নেলসন রকফেলার এর উদ্যোগে নির্মিত ভবনটি ১৯৫২ সাল থেকে জাতিসংঘের সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক আদালত ছাড়া সাধারণ পরিষদ সহ জাতিসংঘের বাকি প্রায় সকল প্রধান শাখা এবং জাতিসংঘের মহাসচিবের অফিস এই ভবনেই অবস্থিত। 

অফিস কক্ষে প্রবেশ করতেই ব্রিগেডিয়ার আমিনকে স্বভাবসুলভ সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে মহাসচিব নিজের গদি মোড়ানো চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন। করমর্দন করতে করতেই সৌজন্যমূলক কুশল বিনিময় শেষে দুজনেই অফিসের এক পাশে সাজানো সোফায় গিয়ে মুখোমুখি বসলেন। ব্রিগেডিয়ার আমিন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশের ডিফেন্স এটাশে হিসেবে নিয়োজিত আছেন এবং কিছুক্ষন আগেই টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রতিনিধির সাথে তার কথা হয়েছে। এত অল্প সময়ের নোটিসে মহাসচিবের সাক্ষাৎ পাবার উদাহরন বেশ বিরল। তবে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী অপহরনের ব্যাপারে মহাসচিবও ওয়াকিবহাল বলেই এবার সেটা সম্ভব হয়েছে। তাই অযথা সময় ক্ষেপন না করে ব্রিগেডিয়ার আমিন সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলেন, ‘ইয়োর এক্সিলেন্সি, মালিতে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে আপনি সম্যক অবগত আছেন।’ তার ভরাট কন্ঠের চোস্ত ইংরেজি উচ্চারণে ভাবাবেগ অত্যন্ত যত্ন করে আড়াল করা। ‘টেররিস্টদের পাঠানো ভিডিওটি ইতোমধ্যে ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটি শুধু বাংলাদেশই নয়, জাতিসংঘের জন্যও বিব্রতকর। আমার সরকার শুধুমাত্র ক্যাপ্টেন রাশেদের নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বিগ্ন না, সেই সাথে টেররিস্টদের দেয়া আল্টিমেটামের ব্যাপারেও উদ্বিগ্ন। কারন আমার সরকার মনে করে যদি ব্যাপারটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে অতিসত্বর সুরাহা না করা হয়, তাহলে অন্যান্য টেররিস্ট সংগঠনগুলোও এতে লাই পাবে আর একই ধরনের হুমকি দিতে শুরু করতে পারে। অন্যতম শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মনে করে এ ব্যাপারে জাতিসংঘের ভূমিকা খুবই গুরত্বপূর্ন এবং শুধু বাংলাদেশই নয় বরং সারাবিশ্বই এখন শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ কী করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।’

মহাসচিব মহোদয় গভীর মনোযোগ আর আন্তরিকতার সাথে ব্রিগেডিয়ার আমিনের প্রতিটি কথা শুনছিলেন। তার কথা শেষ হতেই তিনি নিজের গলা পরিস্কার করে নিয়ে বললেন, ‘ব্রিগেডিয়ার, যা ঘটেছে তার জন্য আমি সত্যি দারুন মর্মাহত। টেররিস্টদের ভিডিওটি সত্যি আমাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে আর মিডিয়াও প্রতিনিয়ত চাপ দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের মত আমরাও এ ব্যাপারে দারুন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছি। কিন্তু বাস্তবতা কী তা আমার মত আপনিও ভালো করেই জানেন। ক্যাপ্টেন রাশেদের জীবন আমাদের সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ন আর শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। তাছাড়া টেররিস্টরা যা চাইছে তা কখনই মেনে নেয়া সম্ভব না। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ আমাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু। সমস্যা হল আমরা শান্তিপূর্ন উপায়ে বিশ্বাসী আর টেররিস্ট হান্ট করাও আমাদের কাজ নয়; তেমন কিছু করবার মত ম্যান্ডেটও আমাদের নেই। আমরা চাইলেই শান্তিরক্ষীদের ব্যবহার করে এমন কিছু করাবার চেষ্টা করতে পারিনা যা শান্তিরক্ষা অভিযানের চিরায়ত ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আশাকরি আপনি এও বুঝবেন যে আমরা টেররিস্টদের সাথে আলোচনার জন্য এক টেবিলে বসতে পারিনা কারন এতে করে আলোচনার টেবিলে বসার যোগ্য বলে তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়, আবার এমন কিছুও করতে পারিনা যাতে প্রতীয়মান হয় যে মুখে মুখে আমরা টেররিস্টদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ন উপায়ে শান্তিরক্ষার কথা বলছি কিন্তু কার্যত ওদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছি। তবে আশার কথা হল, টেররিস্টরা ১০ দিনের সময় বেধে দিয়েছে। তারমানে তারা সমঝোতার একটি পথ খোলা রাখতে চাইছে এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শান্তিপূর্ন উপায়েই বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি সুরাহা করতে পারবে। আর এ ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত সহানুভূতি ও শুভকামনার পাশাপাশি জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সহায়তার নিশ্চয়তাও দিচ্ছি আমি।’ 

ব্রিগেডিয়ার আমিন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজের হতাশা লুকিয়ে মহাসচিবের সাথে কথা শেষ করবার জন্য উপযুক্ত শব্দ খুঁজলেন মনে মনে।

***

‘…রাষ্ট্র কতটা দুর্বল হয়ে গেলে একদল টেররিস্ট একজন শান্তিরক্ষী অফিসারকে আটকে রেখে সেদেশের রাষ্ট্রপতিকে ভিডিও পাঠিয়ে আল্টিমেটাম দেয়, ভাবুন একবার। সার্জিক্যাল অপারেশন চালিয়ে কেন এখনও এর একটা বিহিত করা হচ্ছে না এখনও? কাড়ি কাড়ি ট্যাক্সের টাকায় যে আর্মি পোষা হচ্ছে, কেন তারা এখনও কিছু করছে না…’

ওয়েটিং রুমের টিভির পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে নিজের হাত ঘড়িতে সময় দেখল সাইরাস; রাত আটটা প্রায় বাজতে চলল। পরের মিটিঙের সময় হয়ে গেছে। টিভির টক শো তে কথা বলতে থাকা বক্তার উত্তেজিত কন্ঠের বক্তব্য তখনও চলছে। মনে মনে অবাক হয়ে ভাবল সাইরাস, এসব প্রশ্ন উনি আসলে কাকে করছেন?

সোফা থেকে উঠতে উঠতে রিমোট চেপে টিভিটা বন্ধ করে কনফারেন্স রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল সাইরাস, পেছনে এনার্জি সেভিং স্মার্ট টেকনোলজির কল্যানে ওয়েটিং রুমের সব কটি বাতি স্বয়ংক্রিয় ভাবে নিভে গেল।

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

1 thought on “মিশন তিম্বক্তু (তেইশ)”

  1. Pingback: মিশন তিম্বুক্তু (বাইশ) – Delwar Hossain Khan

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *