Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় ১০

বাশার বিমানঘাঁটি, ঢাকা সেনানিবাস, বাংলাদেশ

রানওয়ে থেকে একের পর এক হেলিকপ্টার তিনটিকে পাঁচটি ভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে উড়ে যেতে দেখল মেজর সাইরাস। সিসির সাথে সেই রাতে কথা বলার পরপরই ক্যাপ্টেন রাশেদের মৃত্যুর সংবাদের ব্যাপারে সংশোধনী দেয়া হয়েছেঃ

গত ১১ জুলাই ২০১৮ তারিখে আফ্রিকার মালিতে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে প্রাথমিকভাবে ছয় বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছিল বলে ধারনা করা হলেও পরে অধিকতর তদন্তে প্রতীয়মান যে, অন্তত একজন শান্তিরক্ষী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। সামরিক পরিভাষায় তাকেমিসিং ইন একশনবলা হচ্ছে। নিখোঁজ শান্তিরক্ষীর নাম ক্যাপ্টেন রাশেদ। তিনি মালিতে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের দোভাষী হিসেবে কাজ করতেন। ক্যাপ্টেন রাশেদকে উদ্ধারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরা।

গতকাল থেকেই পাঁচটা কফিনের সাথে আছে সে। সকালে মালিতে নিয়োজিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ডেপুটি ফোর্স কমান্ডারের উপস্থিতিতে গাও বেইজ ক্যাম্পে জানাজা শেষে কফিনসহ হেলিকপ্টারে চেপে রাজধানী বামাকো বিমানবন্দরে পৌছে তারা। সেখানে এসআরএসজি এবং ফোর্স কমান্ডারের উপস্থিতিতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ফিউনারেল প্যারেড শেষে টার্কিশ এয়ারের এক ফ্লাইটে ইস্তাম্বুল হয়ে ঢাকায় পৌছেছে আজ সকালে।

এরপর সকল বাহিনী প্রধানের উপস্থিতিতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সামরিক মর্যাদায় নিহতদের প্রতি সম্মান জানাবার পর জানাজা শেষে কফিনগুলো হেলিকপ্টারে করে নিজ নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকের কবরের পাশে সেনাবাহিনীর একটি করে ছোট দল অপেক্ষায় আছে। মৃতদেহ পৌছুবার পর যথাযথ ড্রিল শেষে তাদের সমাহিত করে তারা নিজ নিজ সেনানিবাসে ফিরে যাবে।

সাইরাসের খুব ইচ্ছে ছিল নিজ হাতে প্রত্যেককে কবরে নামাবার। কিন্তু এই মুহুর্তে তারচাইতেও জরুরী একটি কাজ তাকে করতে হবে। বাশার বিমানঘাঁটির পার্কিং এ মোনা তার অপেক্ষায় আছে।     

***

মেহনাজ এক আজব পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে!

পরশু দিন সকালে রাশেদের মৃত্যু সংবাদ জানতে পেরেছে ওরা। তারপর কাল আবার আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকেই ফোন করে জানিয়েছে, রাশেদ বেঁচে আছে, তবে নিখোঁজ। রাশেদ মারা গেছে আর রাশেদ নিখোঁজ, ব্যাপার দুটোর মধ্যে আকাশ পাতালের ফারাক। সম্ভবত ওদের খুশীই হবার কথা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, রাশেদ মারা গেছে শোনার পর যতটা ধাক্কা আর কষ্ট তারা পেয়েছিল, রাশেদ নিখোঁজ জানার পর উৎকণ্ঠার মাত্রা যেন বহুগুনে বেড়ে গেছে। আত্মীয় স্বজনেরা সবাই ইতোমধ্যে এগিয়ে এসেছে। সবাই যথাসাধ্য চেষ্টা করছে তাকে আর তার শাশুরীকে সান্তনা দিতে। কিন্তু রাহেলা বেগমের কান্না থামছে না। মেহনাজ নিজেও দুদিন ধরে মুখে কিছুই তুলতে পারেনি।

মেহনাজের কষ্টটা অদ্ভুত! ঠিক কতটা কষ্ট তার পাওয়া উচিত কিংবা স্বামী হারাবার কষ্ট ঠিক কতটা তীব্র হবার কথা, তা তার জানা নেই। আসলে তার নিকটাত্মীয় কাউকেই সে মারা যেতে দেখেনি। তাই এই অনুভূতিটাই তার জন্য ভীষণ নতুন। কোনো এক অজানা কারনে কষ্টের পাশাপাশি খানিকটা লজ্জাও যেন সে পাচ্ছে; সেই সাথে অনিশ্চয়তার এক দুর্ভাবনাময় অনুভূতি!

রাশেদ ছুটি কাটিয়ে মালি ফিরে গেছে প্রায় সাড়ে চার মাস হতে চলল। ভাইবার, ইমো কিংবা হোয়াটস এপে কথা হতো, আর ভিডিও কল দিলে চেহারাও দেখা যেতো।  গত কয়েকটা দিন ধরে শুধু মনে হচ্ছে এই বুঝি রাশেদের কল এলো। সাথে সাথেই সত্যটা নির্মমভাবে মনে পড়ে। তখনই দুচোখ বেয়ে কান্না আসে। রাশেদ এখন নিখোঁজ, বেঁচে ফিরবে কিনা সে নিশ্চয়তা নেই। মেহনাজ অবাক হয়ে ভাবে, রাশেদ সত্যি সত্যি মারা যাবার আগেই এই আজব পরিস্থিতিতে ওরা জেনে গেছে যে ও মারা গেলে ঠিক কতটা কষ্ট ওরা পেতে পারে!  

***

সাইরাস জানেনা ঠিক কিভাবে তার শুরু করা উচিত। তার অনুরোধে একে একে অন্যসব আত্মীয় আর অতিথিরা ধীরে ধীরে ড্রয়িং রুম ত্যাগ করে চলে যাওয়া পর্যন্ত সে আর মোনা অপেক্ষা করল। সবশেষে শুধু রাহেলা বেগম আর মেহনাজ সোফায় বসা রইল। সবাই চলে যাবার পর মোনা তার পাশ থেকে উঠে গিয়ে রাহেলা বেগমের পাশে বসতেই সামনে বসা শোক ম্যুহমান চেহারা দুটো আরেকবার দেখে নিয়ে সাইরাস শুরু করল, ‘আন্টি এবং ভাবী, রাশেদ আমার সাথেই পেট্রোলে গিয়েছিল। অলরেডি আপনারা জানেন রাশেদ নিখোঁজ। আমি এখন আপনাদের যে তথ্যটি জানাবো তা জানানো কতোটা ঠিক হচ্ছে তা আমি জানিনা। তবে এটুকু জানি যে এই মুহুর্তে আপনাদের দোয়া রাশেদের সবচেয়ে বেশি দরকার।’

মুহুর্তেই কান্না জড়ানো বিলাপে ড্রয়িং রুমের পরিবেশ আবারো ভারি হয়ে উঠল। রাহেলা বেগম সম্ভবত ফের মূর্ছা গিয়ে মোনার কাঁধে ঢলে পরলেন। কিন্তু সাইরাস এই মুহুর্তে কথা বলা থামানো সমীচিন ভাবল না, পরে আবার কখন সব খুলে বলার সুযোগ পাবে, সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয়।

‘ভাবী, রাশেদ মালির স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসীদের হাতে ধরা পড়েছে। কিন্তু আপাতত এই কথাটা আপনাকে গোপন রাখতে হবে।’

কথাটি শুনে শাশুরীকে সামলাতে ব্যস্ত মেহনাজের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরল! এতোটা সহ্য করার ক্ষমতা সত্যি তার নেই। তার হাহাকার ভরা আর্তনাদে মোনা রীতিমত কেঁপে উঠল, তার গাল ভিজে উঠল নিরব কান্নার অশ্রুতে! কিন্তু সাইরাসের হাতে যেমন সময় নেই, তেমনি অন্য কোনো উপায়ও তার জানা নেই। কথা তাকে আজ এখনই শেষ করে উঠতে হবে। তাই সে সোফায় শক্ত হয়ে বসে থাকল সামনে শোকে আকুল দুই নারীর সামলে উঠবার অপেক্ষায়।

এখানকার কাজ শেষেই তাকে ছুটতে হবে বঙ্গভবনের পথে!

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

6 thoughts on “মিশন তিম্বক্তু (দশ)”

  1. Pingback: মিশন তিম্বক্তু (নয়) – Delwar Hossain Khan

  2. স্যার পর্বগুলা আরো বড় হলে ভাল হয়।।
    তৃপ্তি মিটছে না।।

  3. Md. Kazol Hossen

    I thought I had become one of the Bangladesh Peacekeepers in Mali. Everything seems to be happening right in front of my eyes. The chest swelled even more to be proud of the Bangladesh Army. Salute, O heroes.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *