Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
“Keep walking, though there’s no place to get to.
Don’t try to see through the distances.
That’s not for human beings. Move within,
But don’t move the way fear makes you move.”

Mawlana Jalal-al-Din Rumi

অধ্যায় ২

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বাংলাদেশ

রিং বাজতে থাকা মোবাইলটি দু হাতে আঁকড়ে ধরে গুটি গুটি পায়ে মায়ের কাছে দৌড়ে এলো ছয় বছর বয়েসি টিয়ারা। ডিনার শেষে সোফায় বসে মায়ের মোবাইলে গেমস খেলছিল সে। টিভি পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই মেয়ের হাত থেকে মোবাইলটি হাতে নিল মোনা। তারপর মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠা নাম্বারটিতে চোখ পরতেই তার বুকটা অজানা আশংকায় কেঁপে উঠল!

নাম্বারটি সাইরাসের স্যাটেলাইট ফোনের নাম্বার!

মোনা জানে তার স্বামী চার-পাঁচ দিনের জন্য লং রেঞ্জ পেট্রোলে (এলআরপি) গাও বেইজ ক্যাম্পের বাইরে গেছে। বেশিরভাগ সময়ই মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকার কারনে এলআরপিতে থাকাকালে ওরা সাধারনত মোবাইলে কল করতে পারে না। তাই স্যাটেলাইট ফোনই যোগাযোগের একমাত্র উপায়। কিন্তু স্যাটেলাইট ফোনে কথা বলা ভীষণ খরুচে বলে সাইরাস তাকে আগেই বলে রেখেছে যে শুধুমাত্র খুব জরুরী কিছু হলেই সে স্যাটফোন থেকে কল করবে।

স্বামীর সাথে অবশ্য মোনার শেষ কথা হয়েছে গতকাল মাঝরাতেই; বাংলাদেশের সাথে মালির সময় পার্থক্য প্রায় ছয় ঘন্টা, তাই সাইরাসের ওখানে তখন সকাল ছয়টা। বনি থেকে রওনা দেবার আগে ওখানকার একটি ভাড়াটে মোবাইলের দোকান থেকে কথা বলেছিল সাইরাস। আগামীকাল ওদের বেইজ ক্যাম্পে পৌছুবার কথা। তাই আজকের এই কল মোনার জন্য স্বভাবতই অপ্রত্যাশিত আর ভীতিকর।

দ্রুত কল রিসিভ করেই সে ব্যাকুল কন্ঠে বলে উঠল, ‘হ্যালো…’
তার কন্ঠের উৎকন্ঠা ছোট্ট টিয়ারারও কান এড়ালো না; অবাক হয়ে মায়ের হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে উঠা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
‘হ্যালো, মোনা, আমি ভালো আছি।’ সাইরাসের শান্ত কন্ঠ মুহুর্তেই মোনার সারা দেহে প্রশান্তির ঝলক বইয়ে দিল।
ইতোমধ্যে পাশ থেকে টিয়ারা ‘পাপা! পাপা! আমি কথা বলব, আমি কথা বলব,’ বলে হৈচৈ শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু একহাতে তাকে সামলে মোনা বলল, ‘এই ফোনে কল করলে যে হঠাৎ?’
‘মোনা, তুমি তো জানোই, এই ফোনে বেশিক্ষণ কথা বলা যাবে না। তাই শান্ত হয়ে আমার কথা শোনো। এখানে এখন বিকেল, দুপুরের দিকে আমাদের একটা এপিসি মাটিতে পুতে রাখা একটা বোমা বার্স্ট হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের ঐ এপিসির ছয়জন স্পটেই মারা গেছে, আর দুজন সিভিয়ারলি উন্ডেড…।’
‘ইয়াল্লা! কী বলছো এইসব? তুমি ঠিক আছো তো…’
‘হ্যাঁ, আমরা বাকিরা সবাই ভালো আছি। এখন গসি নামের একটি গ্রামে আছি। এ জায়গাটা নিরাপদ। আজ রাতে এখানেই থাকব আমরা। কাল বেইজে ফিরে আবার কথা হবে, ইনশাল্লাহ।’
‘পথে আবার যদি কিছু…’
‘নাহ, সামনের পথটা সেইফ, তাছাড়া বেইজ থেকে আরেকটা পেট্রল রাতেই চলে আসবে আমাদের এখানে। একসাথেই ফিরব। আমি এখন ফোন রাখছি। টিয়ারাকে আদর দিও। বাই।’
‘আচ্ছা, বাই।’ অনিচ্ছা সত্ত্বেও জবাব দিল মোনা; ইতোমধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

নির্বোধের মত কিছুক্ষণ মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল মোনা। তারপর আস্তে আস্তে মাথা ঘুরিয়ে হতবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা টিয়ারার দিকে তাকালো। টিয়ারার চেহারায় যুগপৎ বিস্ময় আর অভিমান খেলা করছে। মোবাইলটি বালিশের পাশে ছুড়ে ফেলে টিয়ারাকে হঠাৎ খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠে মোনা। মায়ের কান্না দেখে কোনো কিছু না বুঝেই টিয়ারাও অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। অশ্রুর রঙ এক হলেও কত বিচিত্র সব কারনে আর অকারনেই না আমরা কাঁদি!

***

প্রায় একই সময়ে গসি থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে আরেকটি স্যাটেলাইট ফোন কথোপকথন চলছিল স্থানীয় তামাশেক ভাষায়।

‘আসালামালেকুম।’
‘ওয়ালাইকুমাসসালাম। কাজ হয়েছে?’
‘না, তবে একজন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী পেয়েছি।’
‘বাংলাদেশী? বাংলাদেশী কেন? কথা তো ছিল ফ্রেঞ্চ ট্যুরিস্ট ধরার।’
‘ওরা ভীষণ ভাবে ফায়ার ব্যাক করছিল; কনভয়ের কাছেই ঘেষতে দেয়নি। ওদের কমান্ডার খুব চালু মাল। আমাদের তিনজন ওদের ফায়ারে শহীদ হয়েছে।’
‘ইন্নানিল্লাহ! কিন্তু এই বাংলাদেশীকে দিয়ে কী হবে? গরীব দেশ।’
‘তাহলে কি শেষ করে দেব? এমনিতেও ব্যাটার অবস্থা বেশ কাহিল। টিকিয়ে রাখতে কষ্ট হবে।’
‘না, টিকিয়ে রাখো আপাতত। নিয়ে এসো আমার কাছে। দেখি লিডার কি বলেন?’
‘অপেক্ষায় থাকব। রাখছি তাহলে এবার।’
‘রাখো।’
‘আসালামালেকুম।’
‘ওয়ালাইকুমাসসালাম।’

***

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে মালিতে। তবে বিশাল এক চাঁদ উঠেছে আকাশে। সেই জ্যোৎস্নায় চারপাশ আলোকিত। গসি আর দশটা মরু গ্রামের মতই। সামান্য কিছু ঘর বাড়ি, দোকানপাট, একটা মসজিদ আর একটা কুয়া নিয়েই এই গ্রাম। নিয়ম অনুযায়ী গ্রামের বাইরে খোলা জায়গায় রাতের জন্য ক্যাম্প করেছে মেজর সাইরাসের লড়াই বিধ্বস্ত দল। মাঝখানে কনভয়ের বেসামরিক গাড়িগুলো একত্রে রাখা। যাত্রীরা যে যার গাড়ির ভেতরই রাত কাটাবে। গাড়ির একপাশে শান্তিরক্ষীরা নিজেদের বিভক (একজন মানুষের উপযোগী ছোট তাবু) খাটিয়েছে এক সারিতে। তারপর সামরিক গাড়িগুলো বৃত্তাকারে একটার পেছনে আরেকটা পার্ক করা হয়েছে। এতে করে রাতে ওদের উপর আচমকা কেউ কোনো আক্রমন করার চেষ্টা করলে এই গাড়ির দেয়াল ওদের প্রাথমিক আড় দেবে এবং ওরাও গাড়ির কাভার নিয়ে এপাশ থেকে বাইরে গুলি চালাতে পারবে।

বিভকের  সামনে উবু হয়ে বসে বুট খুলতে থাকা মেজর সাইরাসের দিকে আড়চোখে তাকালো ল্যান্স কর্পোরাল সেলিম।  দুই এপিসির মাঝখানের খোলা জায়গায় তার ডিউটি। রাতের খাবারটা আজ কারো গলা দিয়েই নামেনি। এমনিতেই ‘মিল রেডি টু ইট’(এমআরই) নামের এই শুকনো টিনজাত খাবার স্বাদে জঘন্য; তার উপর সদ্যই ছয়জন সহযোদ্ধা হারাবার শোক। হঠাৎ তার কমান্ডার মেজর সাইরাসের জন্য খুব মায়া হলো সেলিমের।

নিজের বিভকে আসার আগে ওদের প্রত্যেকটা বিভকে একে একে গিয়েছে সাইরাস। তারপর রাতের সেন্ট্রি আর গার্ড কমান্ডারদের সাথে কথা বলেছে। সেলিম জানে, স্বান্তনা দেবার কোনো ভাষাই আসলে তার কমান্ডারের নেই। তাছাড়া কে কাকে কী স্বান্তনাইবা দেবে? তাই রুটিন কিছু কথাবার্তা বলে আর কাল সকালে সকাল সকাল মুভ করতে সবাইকে প্রস্তুত থাকবার কথা বলে সে নিজের বিভকের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করে হঠাৎ দিক বদলে কনভয়ের বেসামরিক গাড়িগুলোর কাছে গিয়েছিল।

সাইরাসকে আসতে দেখে পুরাতন একটা পিক আপের পেছন থেকে দুজন সাদা চামড়ার লোক সামনে এগিয়ে এল। একজন পুরুষ আর অন্যজন নারী। এরা সম্ভবত ট্যুরিস্ট কিংবা সাংবাদিক। দিনে এদের গলায় ক্যামেরা ঝুলতে দেখেছিল সেলিম। দুজনই মাঝবয়েসি। পুরুষটি মোটাসোটা দেখতে, মাথায় চুল কম আর গালে সোনালী রঙের চাপ দাড়ি। মহিলাটি হালকা পাতলা গড়নের তবে বেশ লম্বা। স্থানীয় মহিলাদের মতই পোশাক পরে থাকে, মাথায় স্কার্ফ আর চোখে ভারি কাঁচের চশমা। কী কথা হল বোঝা গেল না। কারন কথাবার্তা ফ্রেঞ্চ ভাষায়ই হচ্ছিল। মেজর সাইরাসও অনর্গল ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলতে পারে। কথা শেষে কুশল বিনিময় করে অলস পায়ে নিজের বিভকের সামনে এসে বুট খুলতে শুরু করেছিল মেজর সাইরাস।

সাইরাসের মনে কী চলছে তা আঁচ করার চেষ্টা করল সেলিম। সে সাইরাসের মাতৃ ইউনিটের সৈনিক হিসেবে দীর্ঘদিন একসাথে একই ইউনিটে চাকরি করেছে তারা। মেজর সাইরাস যে সহজে হাল ছাড়বার পাত্র না তা সে খুব ভালো করেই জানে। সকালের লড়াইয়েও প্রতিপক্ষের কমপক্ষে দুজনকে নিজের সাব-মেশিনগানের গুলিতে ধরাশায়ী করেছে সে। সেলিমের দেখা কমান্ডো অফিসারদের ভেতর সেই সেরা। দেখতে যেমন স্মার্ট, কথাবার্তায়ও খুব স্টাইলিশ। জীবনে কোনো কোর্সে ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হয়নি। এমনকি আমেরিকায় রেঞ্জারদের সাথে কোর্স করা একমাত্র বাংলাদেশী অফিসার সে এবং সেই কোর্সেও বিদেশি অফিসারদের ভেতর প্রথম হয়েছিল সে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল কমান্ডার হিসেবে দারুণ একজন সে! সাথে থাকলে মনে হয় যেন দশজন কমান্ডো বেশি আছে দলে। কোম্পানীর প্রত্যেকের নাম, ঠিকানা এমনকি বাচ্চাদের নাম পর্যন্ত তার মুখস্ত। যে কাজ নিজে পারেন না এমন কাজ করার আদেশ কখনোই দেয় না। ট্রেনিঙয়ের সময় কোনো ছাড় পাবার উপায় নেই তার কাছ থেকে আবার সৈনিকের বিপদে আপদে পাশে দাঁড়িয়ে যায় চীনের প্রাচীরের মত!

নিজের কোম্পানীর অধস্তন সৈনিকদের বুকে আগলে রাখতে জানে সে।  ‘স্যার, আমার সামনে আমার কোম্পানির সৈনিককে বকাঝকা করবেন না, প্লিজ। হয় সমস্যাটা কী সেটা আমাকে বলুন এবং আমি যা করার আমি করছি। আর নাহয় অনুমতি দিন, আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি, তারপর আপনার যা ইচ্ছে করুন।’ তার এমন প্রতিক্রিয়ায় সিনিয়র অফিসাররা কখনো কখনো বিরক্ত হলেও ইউনিটের সৈনিকদের প্রত্যেকে তার কোম্পানীতে পোস্টিং যেতে উদগ্রীব।

সৈনিক জীবনে চাওয়া-পাওয়ার অঙ্কটা বেশ সরল, আর সেই সরল অঙ্কের হিসেবে যথাসময়ে পদোন্নোতি না পাওয়াটা শুধু দুর্ভাগ্যজনকই না, সেই সাথে অসম্মানেরও বটে। একবার ইউনিটে সৈনিকদের প্রমোশন বোর্ডে তার কোম্পানির এক কর্পোরালকে সার্জেন্ট পদে পদোন্নতি দিতে অন্যান্য কোম্পানী কমান্ডারদের একজন আপত্তি করায় অধিনায়ক সেই কর্পোরালের পদোন্নতি দেবার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিলেন। এরপর সেদিন সাইরাসের কোম্পানির যারই পদোন্নতির সুপারিশ চাওয়া হচ্ছিল, তিনি তাকেই অযোগ্য আর অসুপারিশকৃত বলতে লাগলেন। অগত্যা অধিনায়ক যখন অস্বাভাবিক এই ব্যাপারটি ধরতে পেরে মেজর সাইরাসের কাছে এর কারন জানতে চাইলেন, তখন তিনি সবিনয়ে বললেন, ‘কর্পোরাল কুতুব আমার কোম্পানীর সেরা এনসিওদের একজন, আমি ওর কোম্পানী কমান্ডার, আমি নিজ হাতে ওকে ট্রেইন করেছি এবং আমি ওকে সার্জেন্ট র‍্যাঙ্কে রেকমেন্ড করেছি। কিন্তু আপনি অন্য কোম্পানী কমান্ডারদের আপত্তির প্রেক্ষিতে তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করেছেন, যাদের আন্ডারে না কুতুব চাকরি করেছে, না তারা কেউ কখনও কুতুবকে কিংবা আমাকে জানিয়েছে যে কী তার সমস্যা বা দুর্বলতা। তাই যদি কুতুবেরই প্রমোশন না হয়, তাহলে আমার কোম্পানীর বাকিদেরও হওয়া উচিত না।’
সেই বোর্ডেই অধিনায়ক কুতুবের সার্জেন্ট র‍্যাঙ্ক অনুমোদন করেছিলেন। দুর্গম মালির এই মিশন এলাকাতেও সবচেয়ে কঠিন মিশনগুলোতে মেজর সাইরাস আর তার কোম্পানীই কন্টিনজেন্ট কমান্ডারের প্রথম পছন্দ। এমনকি এখানকার বিদেশী ফোর্স কমান্ডার আর পাশের ফ্রেঞ্চ কন্টিনজেন্টের কমান্ডার পর্যন্ত তাকে নাম ধরেই চেনেন।

তবে মেজর সাইরাসের ব্যাপারে সবচাইতে চালু গল্পটি বেশ রহস্যময়। একবার তার ইউনিটের এক সৈনিকের স্ত্রীকে তার গ্রামের এক মাস্তান খুব বিরক্ত করছিলো। সৈনিক ছুটিতে গেলে সব ঠিক, কিন্তু ছুটি থেকে ফিরলেই আবার উৎপাত শুরু হত। অগত্যা সেই সৈনিক ঘটনাটি সাইরাসকে জানালো। সাইরাস তখন ক্যাপ্টেন, ইউনিটের এডজুট্যান্ট। হঠাৎ উনি দুই দিনের ছুটি নিয়ে হাওয়া হয়ে গেলেন। ছুটি শেষে ফিরে আসার কয়েকদিন পর জানা গেল সেই মাস্তানকে কে বা কারা যেন কয়েকদিন আগে বেধরক পিটিয়ে দাঁত, নাক মুখ ফাটিয়ে দিয়েছে। তার উপর বেচারার পেছন দিকটায় এত বেশি মার পড়েছিল যে ডাক্তার নাকি তাকে মাস খানেক চেয়ারে বসতে মানা করে দিয়েছিল আর ঘুমাতেও বলেছে উবু হয়ে।

কেউ জানেনা কে বা কারা তার এই অবস্থা করেছিল, আবার ইউনিটের সবাই জানত কে করেছে এসব। এমন অফিসারের কথায় সৈনিকরা জান দেবেনা তো কার জন্য দেবে। সৈনিকরা সব অফিসারদেরই হাত দিয়ে স্যালুট দেয়, তবে কিছু অফিসারকে স্যালুট করে হৃদয় দিয়ে। মেজর সাইরাস তেমনি একজন বাংলাদেশী অফিসার। উনার ছয় সৈনিক মেরে ফেলেছে, আর উনি ওদের ছেড়ে দেবেন, তা হবার নয়। কিন্তু সেলিম এও ভালো করেই জানে যে শান্তিরক্ষী হিসেবে ওরা বিদেশের মাটিতে চাইলেই কোনো অপারেশন চালাতে পারবে না। তাছাড়া আক্রমনাত্বক অপারেশন চালাবার জন্য যেসব সরঞ্জামাদি লাগে, তাও তাদের সাথে নেই। আনতে হলে দেশ থেকে আনাতে হবে। মেজর সাইরাস কি পারবেন সেই অনুমতি আদায় করে নিতে?

***

নিজের বুট খুলে মেজর সাইরাস বিভকের ভেতর ঢুকে যেতেই ল্যান্স কর্পোরাল সেলিম দ্রুত বিভকের সামনে এসে নিচু হয়ে বুট জোড়া একপাশে সরিয়ে রেখে বিভকের পর্দা সযত্নে গুঁজে দিল। প্রায় সাথে সাথেই ভেতর থেকে সাইরাসের ভরাট কন্ঠ শোনা গেল, ‘সেলিম।’

‘জ্বি, স্যার।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, বাডি।’
‘জ্বি, স্যার।’

নিজের বিভকের মেঝেতে চিত হয়ে শুয়ে আছে সাইরাস; হাত দুটো মাথার নিচে আর দৃষ্টি বিভকের ছাদে। সদ্য প্রয়াত ছয় সহকর্মীর মুখ একে একে ভেসে উঠল সাইরাসের মানসপটে। এদের প্রত্যেকের সাথেই তার কত শত স্মৃতি! তাদের পরিবারের কথা ভেবে ক্ষনিকের জন্য মুষড়ে পরল সে; কালই সবাই দুঃসংবাদটা জানতে পারবে। নিহতদের মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানদের কান্নাভেজা মুখগুলো ছবির মত তার কল্পনায় ভেসে উঠল। হারানো সাথীদের কথা ভেবে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের উপর নিষ্ফল আক্রোশে অস্থির বোধ করল সে। ইচ্ছে করছে এখুনি একটা এপিসি নিয়ে বেরিয়ে পরতে; টেররিস্টদের ক্যাম্প খুঁজে বের করে ওদের সব কয়টাকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিতে! কিন্তু এমন কিছুই সে করতে পারবে না এখন। বেইজ ক্যাম্প থেকে স্পষ্ট নির্দেশ এসেছে; কোনো প্রকার বিলম্ব ব্যতিরেকে তাকে সোজা বেইজ ক্যাম্পে ফিরে যেতে হবে।

স্যাটেলাইট ফোনে মেসেজ আসার মৃদু শব্দে সাইরাসের ভাবনার জাল ছিঁড়ে যায়। মেসেজটা পড়তে গিয়ে চমকে উঠে সে!

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, বেঁচে আছো! নিজের খেয়াল রেখো, প্লিজ।
ক্যাথি

ক্যাথি কিভাবে তার এই অপারেশনাল স্যাটেলাইট ফোনের নাম্বার জানল ভেবে সে দারুণ অবাক হল! তার প্রতি এই ফ্রেঞ্চ ক্যাপ্টেনের একতরফা ‘বিশেষ’ অনুভূতিকে সে সম্মান করে। কিন্তু এই মুহুর্তে এসব কিচ্ছু তার ভাল লাগছেনা। নিজের উত্তেজনা প্রশমন করতে ফোনটা সরিয়ে রেখে ঝট করে উঠে বসে সে, তারপর হামাগুড়ি দিয়ে বিভকের বাইরে বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরালো; আক্রমণকারীদের পরিচয় এখনও তার অজানা, তবু সদ্যহারানো সহযোদ্ধাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে বদ্ধ পরিকর সে। কিন্তু দিশেহারা সাইরাস ভেবেই পাচ্ছেনা যে কিভাবে কী করবে?

উত্তেজিত সাইরাস কষে সিগারেটে টান দিতেই সিগারেটের আগুনের লাল আভায় তার বিমর্ষ মুখটা পাথুরে দেখায়। নিকোটিনের প্রভাবে নিজের স্নায়ুগুলো খানিকটা শিথিল হতেই মনের ভেতর সেই খচখচানিটা ফিরে এলো। তার কম্ব্যাট ইন্সটিঙ্কট বলছে কোথায় যেন একটা ঘাপলা আছে। বিস্ফোরণের পর নিহতদের মৃতদেহগুলো যদিও সহজে আলাদা করা যাচ্ছিল না, তবু বডি ব্যাগ ছয়টাই ভরা হয়েছে, কিন্তু তার মন বলছে ছয়টা মৃতদেহ ওখানে ছিলোনা। পরদিন সকালে তাদের গসি থেকে সোজা গাও এর বেইজ ক্যাম্পে ফিরবার কথা। কিন্তু হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিল সে, কাল সকালে গাও থেকে রি-ইনফোর্স্মেন্ট পেট্রোল এসে পৌছুবার আগেই দুর্ঘটনার জায়গাটা আরেকবার দেখতে যাবে তারা।

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

1 thought on “মিশন তিম্বক্তু (দুই)”

  1. Pingback: মিশন তিম্বক্তু (এক) – Delwar Hossain Khan

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *