Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় ১৬

গ্রান্ড বাজার, ইস্তাম্বুল, তুরস্ক

ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত গ্রান্ড বাজারের ব্যস্ত প্রবেশ পথের ঠিক বাইরে একটা স্ট্রিট ফুড শপে বসে চায়ের কাপে অলস চুমুক দিচ্ছে শফিক; টার্কিশ টি, সাথে সিমিত, মানে তিল দেয়া ডোনাট সাইজের পাউরুটি; স্বচ্ছ কাঁচের কাপের পাশেই একটা পিরিচের উপর কয়েক পিস সুগার কিউব আর টার্কিশ ডিলাইট মিস্টি রাখা। টেবিলের উপর একটা গোলাপী রঙের কার্ড খাড়া করে রাখা; কার্ডে রুমির বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য এগোনি এন্ড ইস্টাসি’এর শেষ পাঁচ লাইন লেখাঃ

You are the Essence of the Essence, 
The intoxication of Love. 
I long to sing your praises
but stand mute
with the agony of wishing in my heart.

সাদা টিশার্ট, নীল জিন্স, চোখে কালো সানগ্লাস আর কব্জিতে পরা ক্যাসিও পাথফাইন্ডার হাতঘড়িতে শফিককে দারুণ দেখাচ্ছে। তার গায়ের রঙ গড়পড়তা বাংলাদেশীদের তুলনায় বেশ ফর্শা। সেই সাথে পেশল দেহ, টিকালো নাক, মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল আর হালফ্যাশানের খোঁচা খোঁচা দাড়ির কল্যানে তাকে অবলীলায় কোনো এক আরব শেখের বখে যাওয়া সন্তান বলে চালিয়ে দেয়া যায়। চেহারার এই সুবিধার কারনেই বাংলাদেশী এসপিওনাজ এজেন্ট হিসেবে বরাবর মধ্যপ্রাচ্য আর ইউরোপীয় দেশ গুলোতেই তার বদলি হয়ে থাকে। এই মুহুর্তে সে ইস্তাম্বুলের কোচ ইউনিভার্সিটির ছাত্র; ভর্তির ব্যবস্থা  বাংলাদেশ সরকারই করে দিয়েছে। তাই চাকরির পাশাপাশি ইতিহাসের উপর দুবছরের মাস্টার্সও হয়ে যাচ্ছে মুফতে।

জুসের গ্লাসে আরেকবার অলস চুমুক দিয়ে নিরাসক্ত ভাবে গ্র্যান্ড বাজারের প্রবেশ পথের দিকে তাকায় শফিক। আসন্ন মিশনের উত্তেজনায় ভেতরে ভেতরে টগবগিয়ে ফুটছে সে, কিন্ত তার ভাবলেশহীন মুডি চেহারায় এর বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। কালো সানগ্লাসের আড়ালে তার চোখ দুটো ঢাকা পরে আছে। অন্যথায় তার চোখের মনির দ্রুত নড়াচড়া দেখে যে কেউ বুঝত যে গ্রান্ড বাজারের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসা প্রত্যেককেই সে যাচাই করছে। এজেন্ট ১২০৫ এর অপেক্ষায় বসে আছে সে।

গ্রান্ড বাজার সত্যি এক রমরমা জায়গা। ট্যুরিস্ট কাউন্ট হিসেবে বিশ্বের এক নম্বর ট্যুরিস্ট স্পট এই গ্রান্ড বাজার। সাদা, কালো, বাদামী সব রঙের সব বয়েসি নারী এবং পুরুষ ট্যুরিস্টে সারা গ্র্যান্ড বাজার ভরপুর। প্রায় সাড়ে ৫০০ বছর আগে গড়ে ওঠা এই বাজারের নামের অর্থ ঢাকনা ওয়ালা বাজার। সেই অর্থে গ্রান্ড বাজারকে বিশ্বের সবচে প্রাচীন শপিং মল বলাই যায়! জুয়েলারি থেকে শুরু করে লেদার জ্যাকেট, জুতা, জামা সবই পাওয়া যায় এই বাজারে। কিছু কিছু দোকান তো পাঁচ ছয়শো বছর পুরাতন! জিনিসপত্রের দাম ইউরোপের তুলনায় কম, আবার এশিয়ার চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি। অবশ্য কেনাকাটার চেয়ে গ্রান্ড বাজারের এইসব দোকান ঘুরে ঘুরে দেখতেই আসলে বেশি মজা! 

হঠাৎ টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ানো মেয়েটিকে দেখে রীতিমত ধাক্কা খেলো শফিক; যেন ঈশ্বর নিজ হাতে সময় নিয়ে বানিয়েছেন এই মেয়েকে! হাটু অবধি লম্বা সাদা থ্রি কোয়ার্টার, গোলাপী টিশার্ট, পায়ে গোলাপী কেডস আর চোখে সাদা ফ্রেমের চওড়া সানগ্লাসে তাকে অপ্সরার মতই লাগছে। পিঠ অবধি ছড়ানো চুল থেকে হালকা বাদামী আভা যেন ঠিকরে বেরুচ্ছে আর সেই আভায় তাকে আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। কোনো প্রকার জড়তা ছাড়াই শফিকের মুখোমুখি বসে অনায়েসে তার হাতের উপর আলতো করে নিজের হাতটি রেখে হাসতে হাসতে মেয়েটি স্পষ্ট বাংলায় বলল, ‘দোয়েল।’

এমনটিই কথা ছিল, এজেন্ট ১২০৫ এসে পাসওয়ার্ডের প্রথম অংশ বলবে। নিয়ম অনুযায়ী দুই অংশের পাসওয়ার্ড কখন একই ধরনের শব্দ হয়না। যেমন ‘দোয়েল’ এর পরের অংশ কোনো পাখির নাম হবে না। শফিক দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে প্রেমিকের সাবলীলতায় এজেন্ট ১২০৫ এর আঙ্গুলের ফাঁকে নিজের আঙ্গুল গলিয়ে দিয়ে বলল, ‘নিউটন।’
পাসওয়ার্ড ম্যাচ করায় দুজনই চোখে চোখ রেখে স্বস্তির হাসি হাসল।

‘আমি শফিক।’
‘আনিকা। অনেক শুনেছি আপনার নাম, আজ দেখা হয়ে গেল।’
‘নাম নাকি বদনাম?’ ভ্রু নাচিয়ে দুষ্টু হেসে বলল শফিক।
‘বদনামটা যে মিথ্যে না তা তো হাত ধরা দেখেই বুঝেতে পারছি,’ বলেই রিনঝিন করে হেসে উঠে আনিকা। জবাবে শফিক নিজের চোখ দুটো কপালে তুলে অবাক হবার ভান করে বলল, ‘সত্য তো এমনিতেই বিশ্বাসযোগ্য; হয়ত সেকারনেই মিথ্যাকে আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়!’ তারপর সেও আনিকার সাথে হাসিতে যোগ দেয়। হাসাহাসি শেষে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জুসের গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে শফিক বলল, ‘এবার চলো।’
‘কোথায়?’
‘রুমির একটা কবিতার বই কিনে দেবো তোমাকে।’
‘সত্যি!’ কপট আহ্লাদে ফেটে পড়ার ভান করে আনিকা, ‘ওকে, চলো।’
খাবারের  বিল পরিশোধ করে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় নামল ওরা দুজন। আনিকা শফিকের বাম হাতের কুনুইয়ের জড়িয়ে ধরে গা ঘেসে হাটছে।

‘কার্ডে লেখা রুমির এগোনি এন্ড ইস্টাসির শুরুর লাইন গুলো জানো?’ হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে শফিক।
‘না তো, তুমি নিশ্চয় জানো। বলো না প্লিজ,’ অনুনয় ঝরে পরে আনিকার কন্ঠে।
হাটতে হাটতেই আবৃতি করে শফিক,

‘In the orchard and rose garden
I long to see your face.
In the taste of Sweetness
I long to kiss your lips.
In the shadows of passion
I long for your love.’

বেলা ১১টার ভেতর তাকসিম স্কয়ারের কাছে প্যান্ডোরা বুক স্টোরে পৌছাতে হবে ওদের!

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *