Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় ৭

ব্যানব্যাট বেইজ ক্যাম্প, গাও, মালি

ব্যানব্যাট কন্টিনজেন্টের সিসি কর্নেল আজাদ একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে মেজর সাইরাসের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চওড়া টেবিলের বাম পাশে বসা কন্টিনজেন্টের উপ-অধিনায়ক লেঃ কর্নেল সামিউল সামনে সিসির মুখোমুখি বসা মেজর সাইরাসের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাসী কন্ঠে বলে উঠলেন, ‘সাইরাস! আর ইউ ইন সেন্স! অলরেডি টিভিতে নিউজ চলে গেছে, বাই নাউ, ডিসিজড আর ইঞ্জুরডদের ফ্যামিলিদেরও জানানো হয়েছে; ফিউনারেলেও ইনভাইট করা হয়ে গেছে…’

কর্নেল আজাদ হাত তুলে উপ-অধিনায়ককে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন। কক্ষ জুড়ে নেমে এলো পিন পতন নিরবতা। কর্নেল আজাদের কঠিন চেহারায় অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। ধারালো চোখের এই অফিসার সেনাবাহিনীর চৌকশ অফিসারদের একজন। এর আগেও দুবার সিয়েরালিয়ন আর কঙ্গোতে ইউএন মিশন করার অভিজ্ঞতা আছে তার। দেশেও পার্বত্য চট্টগ্রামে কমান্ড করেছেন দীর্ঘদিন। অবশ্য মালির মত বিপদজনক মিশন এলাকায় ব্যানব্যাট কন্টিনজেন্টের কমান্ডার হিসেবে বরাবরই সেরাদের সেরাকেই নির্বাচন করা হয়।

কর্নেল আজাদ হঠাৎ করে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে তার রুমের কোনায় গিয়ে কফি পট থেকে নিরবে এক মগ কফি ঢেলে নিয়ে চেয়ারে ফিরলেন। তারপর ধুমায়িত কফির মগে একটি দীর্ঘ চুমুক দিয়ে মেজর সাইরাসের দিকে ধারাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘সাইরাস, আমি জানি তুমি সাফফিশিয়েন্ট এভিডেন্স ছাড়া কথা বলার মত অফিসার নও। টেক ইয়োর টাইম এন্ড টেল মি, হোয়াই ডু ইউ থিং সাম ওয়ান ইজ মিসিং ইন একশন এন্ড ইফ সো, হু ইজ মিসিং?’

‘স্যার, আই ই ডি এক্সপ্লোশনের সময় লিড এপিসির টারেটে আমাদের একজন বসা ছিল।’ শুরু করল মেজর সাইরাস, ‘ইট মে বি ওয়ারেন্ট অফিসার মকবুল অর ক্যাপ্টেন রাশেদ। ইউ নো স্যার, বেটার ভিজিবিলিটির জন্য  লিড এপিসিতে অনেক সময় এভাবে বসে। এক্সপ্লোশনের সময় আমি তাকে ছিটকে উপরে উঠতে দেখেছি কিন্তু তার পরপরই ব্লাস্ট শক, সাউন্ড, এনিমি ফায়ার আর ডাস্টের কারনে আর ফলো করতে পারিনি।’

‘হুম! গো এহেড।’

‘লিড এপিসি এনকাউন্টারড হবার সাথে সাথে ডান দিক থেকে ফায়ার শুরু হয়। দ্যাট ওয়াজ আ সারপ্রাইজ ফর আস। কারন প্রিভিয়াস ইন্টেলের প্রেক্ষিতে আমাদের ধারনা ছিল এম্বুশ হলে বামের উঁচু এলাকা থেকেই হবে। যাহোক, ফায়ার শুরু হবার সাথে সাথেই আমি আমার এপিসি লাইন অফ ফায়ারে এনে মেশিনগান ওপেন করি। মিন হোয়াইল, পেছন থেকে বাকি এপিসি দুটোও এসে আমাদের পাশে ডেপ্লয় করে ফায়ার ব্যাক করা শুরু করে।’

ইতোমধ্যে লেঃ কর্নেল সামিউল আরো দুই মগ কফি ঢেলে এনে একটি মগ সাইরাসের সামনে এগিয়ে দেয়।

কৃতজ্ঞ কন্ঠে ‘থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার,’ বলে সাইরাস আবার শুরু করল, ‘এনিমি ফায়ার থেমে যেতেই আমরা আমাদের এপিসিতে রেস্কিউ ড্রিল শুরু করি। এপিসি উল্টে গিয়েছিল। অনলি সার্জেন্ট কুতুব আর কর্পোরাল হারেসকে আমরা আস্ত পেয়েছি। বাকিদের ডেড বডি আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না। তারপরও ক্যাসেভাকের হেলিকপ্টার আসার পর উন্ডেডদের সাথে সাথে অনুমানের ভিত্তিতে ছয়টি বডি ব্যাগে দেহাবশেষ জড়ো করে তুলে আনা হয়েছে। ডে লাইট কমে আসছিল। সামনে সেকেন্ডারি কোনো আই ই ডি কিংবা এম্বুশ থাকতে পারে এই আশংকায় হেলিকপ্টার চলে যাবার পর পরই আমি আরেকবার ড্রোন দিয়ে চারপাশ চেক করে গসির উদ্দেশ্যে স্টার্ট করি।’

সিসি আর টু আইসি দুজনই ইতোমধ্যে টেবিলে কুনুই ভাঁজ করে মাথা সামনে দিয়ে উন্মুখ হয়ে অপলকে সাইরাসের কথা শুনছে। কফির মগে আরেকটি দীর্ঘ চুমুক দিয়ে সাইরাস ফের শুরু করে, ‘গসিতে নাইট স্টের সময়ই খটকা লাগছিল, স্যার। কোনো লজিক নেই, কিন্তু দেহাবশেষের পরিমান দেখে ওখানে ছয় জনের ডেড বডি আছে বলে কেন যেনো মনটা মানছিল না, স্যার। তাছাড়া এপিসি থেকে একজনের ছিটকে যাবার ব্যাপারটাও মাথা থেকে যাচ্ছিল না। তাই পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই আমরা আবার স্পটে গেলাম। এবার ড্রোন লো ফ্লাই করে টেরেইন চেকের সময় রাস্তার পাশের নালায় এক জায়গায় মাটি ম্যানুয়ালি সরানো হয়েছে বলে মনে হল। পরে ওখানে যাবার পর ক্লোজলি একজামিন করার পর মনে হল আমরা চলে যাবার পর মাটি চাপা পরা কিছু একটা তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওখান থেকে। আগের দিনের ফুটেজ ভালো করে দেখে বুঝলাম এক্সপ্লোশনের পরপরই নালার এখানটায় কিছু মাটি ধ্বসে পরেছিল, দু পক্ষের ফায়ারের কারনে এমন ধ্বসে পরা ক্র্যাটার নালার আরো বেশ কয়েক জায়গায়ও ছিল। কিন্তু অন্যগুলো যেমন ছিল তেমনি আছে, শুধু এটারই মাটি আলগা করা হয়েছে। কাঁচা মাটিতে কিছু হাত আর পায়ের ছাপও ছিল। মোস্ট ইম্পর্ট্যানটলি, স্যার, ওখানকার মাটি এলোমেলো করে দেখবার সময় আমরা এটা পেয়েছি,’ বলে সাইরাস টেবিলের উপর একটি ছেড়া চুইংগামের প্যাকেট রাখল।

‘এটা কী,’ প্যাকেটটি চিমটি দিয়ে তুলে ধরে সিসির সামনে রাখতে রাখতে বলে উঠলেন লেঃ কর্নেল সামিউল।

‘স্যার, এই চুইংগামের প্যাকেটটা এখানকার পিএক্স শপে পাওয়া যায়। পেট্রোলে গেলে আমরা অনেকেই ক্যারি করি, স্পেশালি অফিসাররা। আমার ধারনা এটা রাশেদের পকেটে ছিল।’

‘ইউ মিন, দ্যাট ওয়াজ রাশেদ দেয়ার?’ সবিষ্ময়ে বলে উঠলেন কর্নেল আজাদ।

‘ইয়েস, স্যার। আমার ধারনা, ইট ইজ রাশেদ। এক্সপ্লোশনের সময় সে গড়িয়ে নালার ওখানে আটকা পরেছিল আর ও ঢাল গড়িয়ে নালার ভেতর পরার সময় নালার ঢালের মাটি ওরই চাপে ওর উপর ভেঙ্গে পরে।’

‘তাহলে ও গেল কোথায়? ফায়ার থামার পর তোমরা যখন সার্চ করছিলে তখন শাউট করল না কেন?’ টু আইসি যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলেন।

‘আমার ধারনা ও ব্যাডলি ইঞ্জুরড ছিল, মে বি আনকনশাসও ছিল, তাই আমরা যতক্ষন ছিলাম, ও আমাদের নোটিশে আসেনি।’

‘অর মে বি হি ওয়াজ ডেড…’ টু আইসি যোগ করার চেষ্টা করলেন।

‘আই ডোন্ট থিং সো, স্যার। হি ওয়াজ এলাইভ এন্ড পারহাপস হি ইজ এলাইভ।’

‘হাউ?’ সিসি মুখ খুললেন এবার।

‘রাশেদ নিজে থেকে বের হয়নি, মাটির প্যাটার্ন দেখে মনে হচ্ছে বাহির থেকে কেউ মাটি সরিয়ে ওকে বের করেছে। তাছাড়া ও নিজ থেকে বের হলে ওকে আমরা গসির রাস্তায়ই খুঁজে পেতাম, আর পথ হারিয়ে ফেললেও এতক্ষনে ওর স্যাটফোন থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করত। যারা ওকে উদ্ধার করেছে তারা ওকে জীবিতই পেয়েছে, কারন এই মরুভূমিতে অযথা একটা ডেড বডি ক্যারি করে লাভ কার? লোকালরা যদি পেতো তাহলে এতক্ষনে গ্রামের সর্দারদের কেউ না কেউ সিসির কাছে কল করত। প্রত্যেক গ্রামের সর্দারের কাছেই তো সিসির নাম্বার আছে, তাই কিনা, স্যার?’

‘তাহলে…’ টু আইসি ভয়ঙ্কর ঘটনাটা আন্দাজ করবার চেষ্টা করল।

‘জ্বি, স্যার। যারা আমাদের উপর এম্বুশ করেছিল, আমরা চলে আসার পর তারাই আবার স্পটে এসেছিল ভাঙ্গা এপিসি থেকে কিছু খুলে নিয়ে যাবার আশায়। বাই দেন রাশেদ হয়ত কোনো সাউন্ড করে অথবা অন্যকোনো উপায়ে ওদের দৃষ্টি আকর্ষন করে। তারপর ওরা তাকে ধরে নিয়ে যায়।’

‘ওকে দিয়ে ওরা কী করবে?’ টু আইসি স্বগোতোক্তি করলেন।

‘ওরা ওকে জিম্মি করেছে, দ্যাট হোয়াট আই গেস, স্যার। এতে একটা জিনিস আন্দাজ করা যায় যে ওরা ওকে প্রানে মারবে না। কিন্তু ওর বিনিময়ে ওরা আমাদের কাছে কী চাইবে সেটা আমি আন্দাজ করতে পারছি না, স্যার!’  

‘নাউ হোয়াট?’ টু আইসিকে এবার সত্যি বিভ্রান্ত লাগল। ‘আই এম রিয়েলি সরি টু সে, স্যার, রাশেদ মারা গেছে, এটা অলরেডি ওর ফ্যামিলিও জানে। এখন, সে আসলে মারা যায়নি বরং টেররিস্টদের হাতে জিম্মি হয়েছে, এই কথা ওর ফ্যামিলিকে জানানো আরো জটিল। মোর ওভার, উই আর নট শিউর ইয়েট।’

‘টু আইসি,’ এবার সিসি মুখ খুললেন, ‘রাশেদ মারা গেছে জানার পরও যদি সে আবার ফিরে আসে তাতে কি কারো অখুশি হবার চান্স আছে?’

‘নো, স্যার।’

‘তাহলে আমরা রাশেদের ব্যাপারে ওর কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাইরাসের স্টেটমেন্ট আমাদের বাংলাদেশী হায়ার অথোরিটিকে জানাব। লেট দেম গিভ আস গাইডেন্স। মিন হোয়াইল, যারা রাশেদকে জিম্মি করেছে, লেট দেম সাউন্ড অলসো। ওকে জীবিত ফেরত পেতে যেকোনো নেগোশিয়েশনে যেতে আমি রাজি।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার!’ আদ্র কন্ঠে বলে উঠল মেজর সাইরাস।

‘ওয়েল ডান, সাইরাস।’ জবাবে বললেন কর্নেল আজাদ। ‘আজ অলরেডি ডেড বডির ইউ এন ফর্মালিটিজ শেষ হয়েছে। কাল ডেড বডি দেশে ফ্লাই করবে। আমি চাই তুমি সাথে যাও। ওদের ফ্যামিলিকে আমার পক্ষ থেকে সান্তনা দিও। অলরেডি আর্মি ফান্ড থেকে প্রত্যেক ফ্যামিলির জন্য ইনিশিয়াল গ্রান্ট স্যাংশন করা হয়েছে। আমরাও কন্টিনজেন্টের সবাই নিজেদের বেতন থেকে কিছু ডলার করে দিচ্ছি, বিফিটিং ওয়েতে টাকাটা ওদের হ্যান্ড অভার করো।’

‘ইয়েস, স্যার।’

‘রাশেদের ব্যাপারে তোমার ধারনা আমার কাছে কারেক্ট বলে মনে হচ্ছে। আমি এখুনি আর্মি হেডকোয়ার্টারকে জানিয়ে রাখছি। দেশে ওদের ফিউনারেল ফর্মালিটিজের পর দুই একদিন তোমাকে আর্মি হেড কোয়ার্টারে যেতে হতে পারে। আমাকে যা বলেছ, ওদেরকেও তাই বলো। এখানে রাশেদ রিলেটেড যে কোনো আপডেট পাওয়া মাত্র টু আইসি তোমাকে শেয়ার করবে।’

‘রজার, স্যার।’

‘ফাইনালি, আই নো ইউ আর টায়ার্ড। দেশে পৌছে সব অফিশিয়াল ফর্মালিটিজ শেষে তুমি এক মাস ছুটি কাটিয়ে এসো। রাতেই এডজুট্যান্ট তোমার লিভ কার্ড আর প্লেনের টিকেট পৌছে দেবে। বাকিটা আমরাই এখানে সামলাবো।’
‘কিন্তু, স্যার…’ মেজর সাইরাস কিছু একটা বলতে চাইল।
কিন্তু কর্নেল আজাদ জলদ্গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, ‘দ্যাটস এন অর্ডার, সাইরাস। ডিসমিস।’   

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

2 thoughts on “মিশন তিম্বক্তু (সাত)”

  1. Pingback: মিশন তিম্বক্তু (ছয়) – Delwar Hossain Khan

  2. অজয় সরকার

    স্যার, লাকি সেভেনে আটকিয়ে দেওয়া অন্যায়। আল্লাহর ওয়াস্তে রাতে একটু ঘুমাতে দেন। আর কিছু অংশ ছাড়েন স্যার, প্লিজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *