Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় ২২

ইস্তাম্বুলের লালেলিতে অবস্থিত নিওক্লাসিক্যাল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত ওয়েন্দেম ইস্তাম্বুল ওল্ড সিটি হোটেল একটি পাচ তারকা মানের হোটেল। ২০০৮ সালে চালু হওয়া আধুনিক এই হোটেলটিতে সুপরিসর লবি সহ ২৬৫টি আন্তর্জাতিক মানের গেস্টরুম রয়েছে।

ট্যাক্সি থেকে নেমে সুপ্রশস্ত প্রবেশ পথ আর দীর্ঘ লবি পেরিয়ে কাউন্টারে গিয়ে রুমের চাবি সংগ্রহ করে নিয়ে এলো শফিক; আনিকা ইতোমধ্যে ওর অপেক্ষায় লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ট্যাক্সিতে বইয়ের ভেতর থেকে আনিকার বের করা চাবিটির গায়েই হোটেলের নাম আর রুম নম্বর লেখা ছিল। চাবিটি সেই নির্দিষ্ট রুমের লকারের চাবি। রুমটি আগে থেকেই ওদের নামে বুকিং দেয়া ছিল এবং এই চাবি দিয়ে লকার খুললেই লকারের ভেতর ওদের আসন্ন মিশনের বিস্তারিত পাবার কথা।

রুমে ঢুকেই শফিক ত্রস্ত হাতে লকার খুলতেই ভেতরে প্লেনের টিকেট সহ দুটো নতুন পাসপোর্ট, দুই সেট পরিচয়পত্র, ক্রেডিট কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, আর এক বান্ডেল পশ্চিম আফ্রিকান ফ্রাঙ্ক দেখতে পেল। পশ্চিম আফ্রিকার আটটি দেশে এই একই মুদ্রা প্রচলিত আছে এখন। সবার নিচে সাদা কাগজে বাংলায় লেখা একটি চিঠি। দেরি না করে সবার আগে চিঠিটা পড়ে নিল শফিক।

লকার থেকে পাওয়া সবকিছু নিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকতেই আনিকা প্রশ্ন করল, ‘মিশন?’

‘মালি যাচ্ছি আমরা,’ আনিকার দিকে তার পাসপোর্ট বাড়িয়ে দিয়ে বাংলায় লেখা চিঠিটি পড়তে পড়তেই জবাব দিল শফিক। 

‘এখন থেকে তুমি শেবনেম আর আমি সাদিক। রিলেশন ভাই বোন। বাড়ি কাশ্মীর। আপাতত ট্যুরিস্ট হিসেবে যাচ্ছি তিম্বাক্তু। মালির বামাকোতে পৌছে ফার্দার ইন্সট্রাকশন্স পাবো।’

‘রজার দ্যাট, সাদিক ভাইয়া,’ হাসতে হাসতে টিপ্পনী কেটে নিজের কাজে লেগে গেল আনিকা। যথারীতি  আগে থেকেই দুজনের জন্য দুটো লাগেজ রুমের ভেতর বিছানার পাশে রাখা ছিল। পার্পল রঙের লাগেজ ব্যাগটির হাতল এর কাছে সুতো দিয়ে ঝোলানো ট্যাগ এর গায়ে ইংরেজিতে শেবনেম লেখায় ছিল। তাই নির্দ্বিধায় ব্যাগটি খুলে দক্ষ হাতে নিজের কস্টিউমস আর মেক ওভার সামগ্রী বিছানার উপর সাজিয়ে রাখল আনিকা। তারপর শফিকের উপস্থিতিকে স্রেফ উপেক্ষা করে কোনো সংকোচ ছাড়াই একে একে গায়ের শেষ সুতোটি পর্যন্ত খুলে ফেলতে লাগল। যত দ্রুত সম্ভব তাকে আনিকা থেকে শেবনেমে পরিনত হতে হবে। 

অতি কষ্টে আনিকার উপর থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে কালো রঙের অন্য লাগেজটিতে হাত দিল শফিক। লাগেজ থেকে নিজের জিনিসপত্র নামাতে নামাতে আনিকাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হলো শফিক। আনিকা যে একজন ‘পি’ ক্যাটাগরির এজেন্ট তা চিঠিটি পড়তে গিয়ে মাত্রই জানতে পেরেছে সে। চানক্যের বিষকন্যাদের আদলে তৈরি আর ব্যবহার করা হয় এই এজেন্টদের। আর দশ জন সাধারন এজেন্টদের মত এদের দিয়েও অন্যান্য এসপিওনাজের কাজ করিয়ে নেয়া যায়, তবে এদের স্পেশালাইজেশনের কারনে এদের জন্য নির্ধারিত কাজ অন্যদের দিয়ে করানো অসম্ভব। আর সেকারনেই এদের সংখ্যা হাতে গোনা এবং নিয়োগ বেশ সীমিত।

‘তুমি পি ক্যাটাগরি?’ নিজের মুখে মেক ওভার করতে করতে প্রশ্ন করল শফিক।

‘হুম, চানক্য রাজার বিষকন্যা,’ হাত না থমিয়ে জবাব দিল আনিকা।

‘চানক্য কিন্তু রাজা ছিলেন না…’

‘আমি জানি,’ গালে ভেজা রুমাল ডলতে ডলতে বলল আনিকা। ‘চানক্য ছিলেন কিং মেকার আর মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের প্রধানমন্ত্রী। তার বুদ্ধিতেই স্পাই হিসেবে বিষকন্যাদের তৈরি আর ব্যবহার করা হতো। ছেলেবেলা থেকেই এই মেয়েদের খাবারের সাথে সহনীয় মাত্রায় বিষ খাওয়ানো হতো আর ধীরে ধীরে পরিমান বাড়ানো হতো। ফলে একই বিষ খেয়ে অন্যেরা মারা গেলেও সেই বিষকন্যার কিছুই হতো না। নির্বাচিত বিষকন্যাদের গিফট হিসেবে পাঠানো হতো টার্গেটের কাছে আর মোক্ষম সময়ে বিষ প্রয়োগ করে টার্গেটকে শেষ করে দিত তারা।’

‘এরিস্টটল নাকি তার শিষ্য আলেকজান্ডারকে এই ভারতীয় বিষকন্যাদের ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেজন্যই সম্ভবত আলেকজান্ডারের কোনো ভারতীয় স্ত্রী নেই।’

‘হতে পারে। অবশ্য হানিট্র্যাপ মিশনে এখনও বিষকন্যাদের ব্যবহার করা হয়ে থাকে।’

‘তা ঠিক। ২০০৯ সালে এম আই-৫ একটা চায়নিজ হানিট্র্যাপ ধরতে পেরেছিল। বেশ কিছু প্রভাবশালী পশ্চিমা ব্যবসায়ীদের তথ্য হাতিয়ে নেয়া সহ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল কিছু সুন্দরী। আমেরিকা-রাশিয়া, ভারত-পাকিস্তানও একে অন্যের বিরুদ্ধে হানিট্র্যাপ মিশন চালায়।’

‘তা তো চলছেই। জলজ্যান্ত প্রমান তো আপনার সামনেই দাঁড়ানো। অবশ্য চানক্যের বিষকন্যাদের মত আমাকে চুমু খেলেই আপনি মারা যাবেন না, শফিক ভাই,’ লাস্যময়ী হাসি দিয়ে বলল আনিকা, ‘তবে খালি হাতে মানুষ মারার অনেকগুলো ট্রিক কিন্তু আমি জানি, তাই সাবধান থাকবেন!’ বলে হাসতে হাসতেই চোখ মটকালো সে।

শ্রাগ করে কাজের কথায় ফিরল শফিক, ‘এবারের মিশনটা কি হানি ট্র্যাপ নাকি?’

‘আমিও আপনার মতই অন্ধকারে।’ অকপটে স্বীকার করল আনিকা। ‘তবে ইনিশিয়ালি মাল্টি-পারপাস রোলেই হয়ত পাঠাচ্ছে। যদি হানি ট্র্যাপের প্রয়োজন হয়, তাহলে চাইলেই মালিতে পাবার মত আনিকা বাংলাদেশের হাতে খুব বেশি নেই কিন্তু।’ কথা শেষে রিনরিনিয়ে হেসে উঠল আনিকা।

‘ক্যাপ্টেন রাশেদের ভিডিওটা তো দেখেছ?’

‘দেখেছি। হয়ত আমাদের মালি অভিযানের কারন সেটাই।’

‘আমারও তাই ধারনা। চলো মালি গিয়ে দেখি কী অপেক্ষা করছে।’

কথা শেষ করে আনিকার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল শফিক। কিছুক্ষন আগের আধুনিকা আনিকা এখন ষোল আনাই কাশ্মীরী সরলা শেবনেম!

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

1 thought on “মিশন তিম্বুক্তু (বাইশ)”

  1. Pingback: মিশন তিম্বক্তু (একুশ) – Delwar Hossain Khan

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *