Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

অধ্যায় ১২

বঙ্গভবন, ঢাকা, বাংলাদেশ

বঙ্গভবনের সুপরিসর কনফারেন্স রুমের এক কোনায় নিরবে একাকী বসে আছে মেজর সাইরাস।
আমেরিকার হোয়াইট হাউস আর ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের সমমর্যাদা সম্পন্ন বঙ্গভবন বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা। মুঘল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত বঙ্গভবন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন এবং অফিস। বৃটিশ আমলে এখানে মানুক নামের এক আর্মেনিয় জমিদারের জমিদার বাড়ি ছিল। পরে ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি জায়গাটি কিনে নিয়ে নিজের বাংলো তৈরি নাম দেন দিলখুশা। বঙ্গভঙ্গের সময় পূর্ববাংলা ও আসাম সরকার জায়গাটিকে সংস্কার করে ভারতের ভাইসরয়ের বাসভবনে রূপান্তরিত করেন এবং পাকিস্তান আমলেও  পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এখানেই বসবাস করতেন বলে এটি গভর্নর হাউজ নামেই পরিচিতি পেয়েছিল। ১৯৬১ সালের ঝড়ে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এটি পুনর্নিমাণ করা হয়। ১৯৬৪ সালে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর গভর্নর হাউসের নাম পরিবর্তন করে বঙ্গভবন রাখা হয়।

বেলা সাড়ে তিনটায় কনফারেন্স। এই কনফারেন্সে তার চেয়ে জুনিয়র কারো উপস্থিত থাকবার সম্ভাবনা কম ভেবে ইচ্ছে করেই আধাঘন্টা আগেই বঙ্গভবনে উপস্থিত হয়েছে সাইরাস। আসবার আগে রাশেদের বাসা থেকে বের হয়ে মোনাকে নিয়ে সোজা টিয়ারার স্কুলে গিয়েছিল। তারপর মা আর মেয়েকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে এসেছে। লাঞ্চ করবার সুযোগ হয়নি তাই ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। যাহোক, কনফারেন্স শুরু হবার পর নিশ্চয় হালকা নাস্তা দেয়া হবে, সেটাই এখন ভরসা।

এর আগে কখনও বঙ্গভবনে আসা হয়নি সাইরাসের, আর বঙ্গভবনে ঢুকবার মুখেই তার মোবাইল ফোনটাও রেখে দেয়া হয়েছে। অগত্যা বেশ আগ্রহ নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চারপাশটা দেখতে শুরু করল সে। সর্বাধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত অত্যাধুনিক এক কনফারেন্স রুম; মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হল সাইরাস। কনফারেন্স টেবিল জুড়ে প্রত্যেকটি আসনের জন্য সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল নেইম ট্যাগ লাগানো দেখতে পেলো সে। এক প্রান্তে মহামান্য রাস্ট্রপতি, তার দুপাশে ক্রমান্বয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পররাস্ট্র মন্ত্রী, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক উপদেষ্টা, সেনা প্রধান,  সামরিক সচিব, ডিজিএফআই ও এনএসআই মহাপরিচালক, সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তর এবং ওভারসিজ মিলিটারি অপারেশনসের পরিচালকের নাম লেখা রয়েছে। কনফারেন্স টেবিলের চেয়ারের সারির পেছনে আরেক সারি চেয়ার দেয়ালের সাথে লাগানো দেখতে পেয়ে মহামান্য রাস্ট্রপতির চেয়ার থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী চেয়ারটায় গিয়ে বসল সাইরাস।

ঠিক তিনটা বিশে মহামান্য রাস্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া বাকি সবাই প্রায় একযোগে কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করে যার যার আসনে বসে গেল। এদের প্রায় সবাইকেই চেনে সে, টিভিতে অনেকবার দেখেছে এদের মুখ, তবে সামনা সামনি দেখেনি কখনো। জাতিসংঘ মিশনের সুবাদে একমাত্র ওভারসিজ মিলিটারি অপারেশনসের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আখতারই তার পূর্ব পরিচিত। তিনি ঠিক তার সামনের চেয়ারেই বসা। সকালেই ফিউনারেল প্যারেডের আগে তার সাথে দীর্ঘ সময় কথা হয়েছে।

ঠিক সাড়ে তিনটায় রাস্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী একসাথে প্রবেশ করতেই সবাই উঠে দাঁড়াল। নিজের চেয়ারে বসতে বসতে রাস্ট্রপতি সবাইকে বসতে অনুরোধ করলেন। তারপর সামনের মাইকটি সামান্য মুখের কাছে টেনে এনে বললেন, ‘উপস্থিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী মহোদয় গন, উপদেস্টাগন, সেনাবাহিনী প্রধান, সামরিক সচিবগন, গোয়েন্দাবাহিনী প্রধানগণ এবং অন্য সকলকে আমি আজকের কনফারেন্সে স্বাগত জানাচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধেই এই বিশেষ সভা আয়োজন করা হয়েছে। তাই তাকেই আজকের আলোচনা শুরু করার জন্য অনুরোধ করছি।’

‘ধন্যবাদ, মহামান্য রাস্ট্রপতি।’ গম্ভীর কন্ঠে শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী। তার চেহারা বেশ থমথমে আর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। ‘আপনারা সবাই ইতোমধ্যে জেনেছেন যে গত তিনদিন আগে মালিতে আমাদের পাঁচজন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন এবং একজন এখনও নিখোঁজ। আজ সকালে নিহতদের ডেডবডি দেশে এসে পৌছেছে এবং যথাযথ সামরিক মর্যাদায় তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মালির এই মিশনটি সারাবিশ্বের সবচাইতে বিপদজনক শান্তিরক্ষা মিশন। এর আগেও মালিতে আমরা বেশ কিছু শান্তিরক্ষী হারিয়েছি। সরকার এবং সেনাবাহিনী যথাসাধ্য চেষ্টা করছে আমাদের শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। সম্প্রতি আমরা ফ্রান্স থেকে মাইন প্রোটেক্টেড এপিসি আর তুরুস্ক থেকে ড্রোন কিনে পাঠিয়েছি। এসবের জন্য ইউএন আমাদের কোনো খরচ দেবে না। কিন্তু আমাদের শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা তা পাঠিয়েছি। তারপরও মালির মত দেশে যেখানে আল কায়েদার মত শক্তিশালী টেররিস্টরা অপারেট করছে, সেখানে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কারো পক্ষেই সম্ভব না। তাই আন্তর্জাতিক মহলে শান্তিরক্ষী প্রেরনে আমাদের বিগত ত্রিশ বছরের ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে আমাদের শান্তিরক্ষীদের এই ত্যাগ আমাদের মেনে নিতেই হবে। কিন্তু আমাদের আজকের আলোচনার উদ্দেশ্য আরও গুরুতর কিছু। তাই আলোচনা শুরুর আগে আমরা সবাই একটি ভিডিও ক্লিপ দেখব। ক্লিপটি সকালেই ইন্টারনেটে ছাড়া হয়েছিল। তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয় দ্রুতই ভিডিওটি ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইতোমধ্যেই তা আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে এবং আশংকা করা হচ্ছে যে দ্রুতই তা ভাইরাল হতে শুরু করবে।’

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর এডিসি মাল্টিমিডিয়া প্রোজেক্টরের পাশে গিয়ে স্থান নিয়েছে। এবার প্রধানমন্ত্রীর ইশারা পেতেই ভিডিওটি চালু করল সে। প্রজেক্টরের বিশাল পর্দা ছাড়াও প্রত্যেকের সামনে কনফারেন্স টেবিলের কাঁচের নিচে বসানো এলইডি স্ক্রিনে ফুটে উঠা প্রথম দৃশ্যটি দেখে অন্য সবার মত মেজর সাইরাসও দারুনভাবে চমকে উঠল!

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

1 thought on “মিশন তিম্বুক্তু (বার)”

  1. Pingback: মিশন তিম্বক্তু (এগার) – Delwar Hossain Khan

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *