Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

বার্মিজ নীলনকশা
রোহিঙ্গাদের ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত সংখ্যালঘু (one of the world’s least wanted minorities) ও চরম নিগৃহীত সম্প্রদায় (most persecuted people) হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের উপর চলা গণহত্যা (genocide)কে জাতিগত নির্মূল (ethnic cleansing) বলে স্বীকৃতি দেয়। অথচ ১৯৭৮ সাল থেকে বার্মিজ সামরিক জান্তা পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের বার্মা থেকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা শুরু করে এবং ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বার্মার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সদম্ভে ঘোষনা দেন যে মায়ানমারে রোহিঙ্গা বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই আর কখনো ছিলও না!

১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত বার্মায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী উ নু রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বলেই ডাকতেন। কিন্তু ১৯৮২ সালে তাদের বার্মিজ নাগরিকত্বের অধিকার রাষ্ট্রীয় ভাবেই হরন করা হয়। সাধারন বার্মিজদের দেয়া হয় লাল পরিচয় পত্র আর রোহিঙ্গাদের দেয়া হয় সাদা পরিচয় পত্র, যার মানে রোহিঙ্গারা সাধারন বার্মিজ নাগরিক নয় বরং বহিরাগত। এরফলে সরকারি চাকরিতে যোগ দেয়ার ও বার্মিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা লাভের কোন অধিকারই থাকল না তাদের এবং দেশের ভেতরও আরাকান/রাখাইন বাদে অন্যান্য এলাকায় অবাধে ভ্রমনের অনুমতি হারাল তারা। সামরিক জান্তা নিজ দেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিপীড়নের বৈধতা পেতে থেরাভেদা বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের উস্কে দিল ইসলাম বনাম বৌদ্ধ ধর্মের দোহাই দিয়ে। একই সাথে অভিবাসী আইনের আওতায় তাদের উপর ততমাদো এবং বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের নির্যাতন পেল বৈধতা!

দুটোর বেশি সন্তান নেবে না মর্মে মুচলেকা দিতে হয় রোহিঙ্গা দম্পতিদের। বহু রোহিঙ্গাদের বসতভিটা ক্রোক করে নিয়ে বার্মার বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা বৌদ্ধ সেটেলারদের দিয়ে দেয়া হয়েছে রাখাইনে বৌদ্ধ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে। সেই সাথে প্রত্যেক সক্ষম রোহিঙ্গা পুরুষকে সপ্তাহে একদিন বাধ্যতামূলক সামরিক ক্যাম্পে বা সরকারি প্রকল্পে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে হয় এবং সপ্তাহে এক রাত বাধ্যতামূলক সেন্ট্রি ডিউটি দিতে হয়। ২৯ মার্চ ২০১৪ তারিখে বার্মিজ সরকার ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিও নিষিদ্ধ করে দেয় এবং রোহিঙ্গাদের ‘বাঙ্গালী’ বলে ডাকতে শুরু করে।

রোহিঙ্গা কারা?
অথচ রোহিঙ্গা শব্দটি প্রাক-উপনিবেশিক কালে ‘রুইঙ্গা’ বা ‘রোয়াঙ্গিয়া’ হিসেবে উচ্চারিত হত, যার মানে ‘রোহাং এর বাসিন্দা’। আরাকানের পূর্ব নাম ‘রোহাং’ বা ‘রাখাঙ্গা’ বা ‘রোসাঙ্গা’ থেকে শব্দটি উদ্ভূত বলে ধারনা করা হয়ে থাকে। আবার অনেকের ধারনা আরবী ‘রহম’ শব্দ থেকে নামটি এসেছে যা আরবী বনিকদের দেয়া নাম। ১৭৯৯ সালে লেখা ফ্রান্সিস বুকানানের প্রবন্ধেও রোহিঙ্গাদের কথা এবং রোহিঙ্গাদের ভাষা রুইঙ্গা (Rooinga) র উল্লেখ আছে। ১৮১৫ সালে জোহান সেভেরিন ভাতেরও তার কম্পেন্ডিয়ামে রুইঙ্গা (Ruinga) দের নিজস্ব ভাষা সহ একটি বার্মিজ নৃগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ১৯৩৬ সালে বৃটিশ বার্মার আরাকানে ‘রোহিঙ্গা জামায়েতুল উলামা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য ক্রিস্টিনা ফিঙ্কের মত অনেকেই ভাবেন যে রোহিঙ্গা আসলে জাতিগত পরিচয় না বরং আরাকান/রাখাইনে একটি মুসলিম অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রেক্ষিতে দেয়া একটি রাজনৈতিক পরিচয়।

আরাকানের রোহিঙ্গাদের সলুক সন্ধানে
আরাকান মায়ানমার (বার্মা)-এর একটি অঙ্গরাজ্য। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত এবং অতি প্রাচীনকাল থেকে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আরাকানের উত্তরে চীন ও ভারত, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, উত্তর ও পশ্চিমে বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্ব সীমান্তবর্তী নাফ নদীর মধ্যসীমা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম। পূর্বে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী ইয়োমা পর্বতমালা। নাফ নদী আরাকান ও বাংলাদেশের মধ্যে সীমান্ত রেখা হিসেবে কাজ করে। বৃটিশ শাসিত আরাকানের আয়তন ছিল ২০,০০০ বর্গ মাইল। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা উত্তর পার্বত্য আরাকান বার্মার চিন প্রদেশে এবং দক্ষিণ আরাকানের কিছু অংশ লোয়ার বার্মার ইরাবতি প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত করায় বর্তমানে এখানকার আয়তন ১৪,২০০ বর্গমাইল। ১৯৯০ সালে বার্মিজ সামরিক জান্তা আরাকানের নাম বদলে ফেলে এবং এখন এলাকাটি রাখাইন নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিকভাবে, এই আরাকান প্রথমে ছিল বাংলার চন্দ্র রাজবংশের অধীনে করদ রাজ্য এবং উজালি বা বৈশালি ছিল এই রাজ্যের রাজধানী। আরাকান রাজ বংশসমুহে শুরু থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতির প্রকট প্রভাব লক্ষনীয়।তবে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক থেকেই আরব্য বনিকেরা আরাকানে তাদের বানিজ্য জাহাজ নোঙ্গর করতে শুরু করে। আর ৭৮৮ সাল থেকে তারা বানিজ্যের পাশাপাশি বসতি স্থাপন করে ইসলাম ধর্ম প্রচারও শুরু করে এখানে। তাই রোহিঙ্গা মুসলমানদের ইতিহাসের শুরুও এখান থেকেই। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানীদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তীতে চাঁটগাইয়া, রাখাইন, আরাকানী, বার্মিজ, বাঙালী, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের মিশ্রণে উদ্ভুত এই সংকর জাতি এয়োদশ-চর্তুদশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

খ্রিস্টীয় দশম শতক থেকে মধ্য বার্মার লোকেরা আরাকানে যাতায়ত শুরু করে। রাখাইনরা ছিল বার্মার পিউ নগর রাস্ট্রের একটি উপজাতি। তারাই প্রথমে মধ্য বার্মা থেকে আরাকান পর্বতমালা অতিক্রম করে আরাকানে আসে এবং লেমরো নদীর উপত্যকায় বসতি গড়ে তোলে। ১৪০৪ সালে আরাকান শাসন করতেন রাজা নরমিখলা। ১৪০৬ সালে বার্মার রাজা মেংশো আই আরাকান দখল করলে নরমিখলা তৎকালীন বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় নেন। তখন ইলিয়াস শাহীর রাজবংশ গৌর থেকে বাংলা শাসন করতেন। গৌরের সুলতান জালালুদ্দীন শাহের সাহায্যে নরমিখলা ১৪৩০ সালে স্বীয় রাজ্য ফিরে পান। নরমিখলা ধর্মান্তরিত হয়ে মুহাম্মদ সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেছিলেন। সেই থেকে আরাকানের রাজারা বৌদ্ধ নামের পাশাপাশি একটি মুসলিম নামও ধারণ করতে শুরু করেন। নরমিখলা আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে লঙ্গিয়েত থেকে ম্রোহং এ নিজ রাজধানী স্থানান্তর করেন এবং ম্রাউক-উ রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করে বাংলার করদ রাজা হিসেবে শাসন কার্য পরিচালনা করতে থাকেন। ম্রাউক-উ রাজবংশের রাজাগণ ১৪৩০-১৭৮৫ খ্রি: পর্যন্ত ৩৫৫ বছরকাল আরাকানে রাজত্ব করেন।

তবে বাংলার সুলতান জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ এর মৃত্যুর পর রাজা নরমিখলার পরবর্তি আরাকান রাজেরা ১৪৩৭ সালে রামু ও ১৪৫৯ সালে চট্টগ্রাম দখল করে নেয়। ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকানের দখলে ছিল। এ সময় পর্তুগীজ হার্মাদ (পর্তুগিজ ‘আর্মাডা’ শব্দের অপভ্রংশ) জলদস্যুদের সহায়তায় আরাকানের মগ দস্যুরা বাংলায় অবাধ লুণ্ঠন, অপহরণ ও নির্বিচারে ধর্ষন চালাত।

সুলতান হুসেন শাহের রাজত্বকালে বঙ্গদেশে সর্বপ্রথম পর্তুগিজ হার্মাদ বণিকদের আবির্ভাব ঘটে। ক্রমে চট্টগ্রাম, সপ্তগ্রাম ও হুগলি এদের বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। এরা তখন বিচ্ছিন্নভাবে বাংলার নানা স্থানে ঘাঁটি বানিয়ে লুঠপাট চালাত। ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ অধিনায়ক মেলো বাণিজ্যের ছলে এসব স্থানে অত্যাচার শুরু করায় তাঁকে অনেকদিন গৌড়ে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম এদের সম্পূর্ণ অধিকৃত হয়। প্রথমে এদের সাথে আরাকান-রাজের যুদ্ধ সংঘটিত হলেও পরে মগ ও পর্তুগিজ দস্যুরা একত্রে মিলে যায়। সন্দ্বীপের মোগল-শাসনকর্তা এই দস্যুদের হাতে নিহত হওয়ার পর সেখানকার পরবর্তী মোগল-শাসক ফতে খাঁ হার্মাদদের চূড়ান্ত ধ্বংস করতে যুদ্ধ-জাহাজ নিয়ে অভিযান চালান। নৌযুদ্ধে পারদর্শী পর্তুগীজগণ তাঁকে সৈন্যসহ পরাস্ত করে নিহত করে। এদের দস্যুনেতা সিবাশ্চিয়ান গন্জালিস সন্দ্বীপ দখল করে সেখানকার মুসলমানদের নির্মূল করে।

এরপর গন্জালিস ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আরাকান অধিকারে ব্যর্থ হয়ে আরাকান-রাজের সঙ্গে মিলে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত দখল করে নেয়। মোগলরা এক প্রকাণ্ড বাহিনী এনে এদের পরাস্ত করে। তারপর গন্জালিস গোয়ার পর্তুগিজ শাসকের অধীনতা স্বীকার করে ডন ফ্রান্সিস নামক সেনাপতি সহ একদলসৈন্য এনে আরাকানের প্রান্তভাগ লুন্ঠন করে। আরাকান-রাজ ওলন্দাজদের সাহায্যে পর্তুগিজদের সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দে সন্দ্বীপ দখল করে নেন।

১৬৫৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লীর মোগল সম্রাট শাহজাহান মারা গেছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পরে। এ সময় বাংলার সুবাহদার হিসেবে দায়িত্বরত শাহাজাদা সুজা রাজমহলে বসে নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করেন এবং রাজধানী দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হন। তবে বাহাদুরপুরের যুদ্ধে আরেক শাহাজাদা দারার হাতে পরাজিত হয়ে সুজা রাজমহলে ফিরে আসেন। কিন্তু আরেক শাহাজাদা আওরঙ্গজেব শাহাজাদা দারাকে পরাস্ত ও হত্যা করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এরপর খাজোয়াতের (ফতেহপুর জেলা, উত্তর প্রদেশ, ভারত) যুদ্ধে আওরঙ্গজেব সুজাকেও পরাজিত করেন। পরাস্ত শাহাজাদা সুজা এরপর বাংলা ত্যাগ করে আরাকানে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজ বাহিনীর অবশিষ্ট সেনাদের নিয়ে সপরিবারে আরাকানের রাজধানী ম্রোহং (ম্রৌকউ) পৌঁছন। আরাকানের রাজা ‘চন্দ্রসুধর্ম্মা’ সুজাকে সাদরে গ্রহণ করলেও পরে সুজার সম্পদ হস্তগত করে সুজার কন্যাদের জোরপূর্বক বিয়ের চেস্টা করায় সুজার সঙ্গে রাজার বিরোধ বাধে। পরে সুজাকে তাঁর পরিবার ও দলবলসহ নিপীড়ন করে হত্যা হয়। তবে সুজার সাথে আসা লোকেরা আরাকানেই বসতি গেড়েছিল।

১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে নবাব শায়েস্তা খাঁ সেনাপতি হুসেনবেগের সহায়তায় আরাকান-রাজকে সম্পূর্ণ পরাজিত করে মোগলদের হৃত-ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন; ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সেনাপতি ওমেদ খাঁ ও হুসেনবেগ চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ দখল করে। আরাকান-রাজের সৈন্যদলের মধ্যে অনেক মগ ও অবৈতনিক পর্তুগিজ সৈন্য ছিল। এরা বছরে বারোমাস লুণ্ঠন, অপহরণ ও অত্যাচার চালাত। শায়েস্তা খাঁর এই দুর্ধর্ষ অভিযানে চট্টগ্রাম থেকে পর্তুগিজ ও মগেরা অতি ক্ষিপ্রকারিতায় পালানোর (স্থানীয়ভাবে এই ঘটনা ‘মগ-ধাওনি’ নামে খ্যাত ছিল) সময় ১,২২৩টি কামান ফেলে যায়। এইভাবে গোটা বাংলায় “মগের মুল্লুক”-এর অবসান ঘটে।

১৭৮৫ সালে বার্মিজ রাজা বোদাপায়া আরাকান দখল করলে ১৭৯৯ সালে প্রানভয়ে প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বৃটিশ ভারতের অধীন চট্টগ্রামে আশ্রয় নেয়। বৃটিশরা পরে এংলো-বার্মিজ যুদ্ধে জয়ী হয়ে সমগ্র বার্মা দখল করে নেয় এবং শুরু থেকেই তারা রোহিঙ্গাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল। কৃষিকাজের জন্য আরাকানের কম জন-অধ্যুষিত এবং উর্বর উপত্যকায় আশপাশের এলাকা থেকে ভারতীয় ও বাঙালিদের অধিবাসীদের অভিবাসিত করেছিল ব্রিটিশরা এবং বাংলাকে আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল। আরাকান ও বাংলার মাঝে কোন আন্তর্জাতিক সীমারেখা ছিল না এবং এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যাওয়ার ব্যাপারে কোন বিধিনিষেধও ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রোহিঙ্গা মুসলমানদের সমর্থন অব্যহত রাখতে বৃটিশরা যুদ্ধের পর আরাকানকে আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে বলে কথাও দেয়। এর ফলে ১৯৪২ সালে জাপানীদের চাপে বৃটিশরা বার্মা থেকে পিছু হটলে জাপান সমর্থক বৌদ্ধ রাখাইনরা আরাকানের বৃটিশ সমর্থক রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়ে তাদের দেশ ছাড়া করে (আরাকান ম্যাসাকার-১৯৪২)।

১৯৪০ সালেই রোহিঙ্গা মুসলমানেরা বৌদ্ধ অধ্যুষিত বার্মা ত্যাগ করে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হবার চেস্টা শুরু করে। ১৯৪৮ সালে রোহিঙ্গা নেতারা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে দেখা করে তাদের এই দাবী উত্থাপন করে এবং নর্থ আরাকান মুসলিম লিগ গঠন করে। কিন্তু বার্মিজ সমস্যায় নাক গলানো সমিচীন হবেনা ভেবে জিন্নাহ এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন।

১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হবার পর রোহিঙ্গাদের বার্মিজ (indigenous ethnic nationality of Burma) হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং মন্ত্রী সহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে তারা নিয়োগ পায়। কিন্তু ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা সরকার গঠনের পর থেকেই রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ ও নিধনের নীলনকশা বাস্তবায়ন শুরু হয়।

কেন এই রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ?
প্রথমত, বার্মা স্বাধীন হবার আগেই ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বৃটিশদের দেয়া স্বাধীন আরাকানের প্রতিশ্রুতি যা বৃটিশরা রাখতে পারেনি। এর কারনে বার্মিজ ও রোহিঙ্গাদের মাঝে অবিশ্বাস গড়ে উঠে। উপরন্তু বার্মা স্বাধীন হবার আগেই পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হবার উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গা নেতাবৃন্দ কর্তৃক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে তদবির করার ফলে বার্মিজদের আস্থাহীনতা আরো বাড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত, থেরাভেদা বৌদ্ধ ধর্মের ধারক রাষ্ট্র হিসেবে বার্মা রোহিঙ্গাদের ধর্ম ইসলামকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি হুমকি হিসেবে ভাবতে শুরু করে। জান্তা সরকার এই বিষয়টি কাজে লাগিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সহানুভূতি পাবার পাশাপাশি বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের উস্কে দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সুযোগে রোহিঙ্গাদের বার্মা ছাড়া করার চেস্টা করে।

তৃতীয়ত, আরাকান/রাখাইন স্টেটে চীন ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক আগ্রহের কারনে বিপুল বিনিয়োগ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। এই সম্ভাবনাময় প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের পথে সেখানে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলমানদের লাভবান হবার যে সম্ভাবনা আছে তা নস্যাৎ করতেই বার্মা থেকে রোহিঙ্গাদের চিরতরে বিতারিত করতেই এই নজিরবিহীন নিধনযজ্ঞ।

শরনার্থী রোহিঙ্গা
২০১৬-১৭ সালের ভয়াবহ নির্যাতনের পূর্বে অনুমানিক দশ লাখ রোহিঙ্গা মায়ানমারে বসবাস করত বলে ধারনা করা হয়। কিন্তু ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ভেতর সেই এক মিলিয়নের মধ্যে সোয়া ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়। সারাবিশ্বে বর্তমানে প্রায় পনের থেকে বিশ লাখ রোহিঙ্গা অবশিষ্ট আছে। প্রতি সাত জন দেশছাড়া মানুষের একজন এখন রোহিঙ্গা মুসলমান। সেই বিশ লাখ রোহিঙ্গার ভেতর তের লাখের বেশি বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধনের কাজ শুরু করা হয় এবং বাংলাদেশে আসা নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে ১১ লাখ ৩ হাজার ২৭২ জন। কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবির এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির (৫,৪৭,৬১৬ জন শরনার্থী)। এই বাস্তবতায় গত ১ মার্চ ২০১৯ তারিখ হতে আর কোন নতুন রোহিঙ্গা শরনার্থী গ্রহন করা হবেনা মর্মে বাংলাদেশ ঘোষনা দেয়।

মার্চ ২০১৯ এর পরিসংখ্যান মতে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৩৪ টি ক্যাম্পে নয় লাখ নয় হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত দুটি শরণার্থী শিবিরের মধ্যে একটি হল উখিয়ায় অবস্থিত কুতুপালং শরনার্থী শিবির, আর অন্যটি হচ্ছে টেকনাফে অবস্থিত নয়াপাড়া শরণার্থী শিবির। রোহিঙ্গাদের জন্য ইউএনএইচসিআর এর স্থাপিত কার্যালয়টি কুতুপালংয়ে অবস্থিত যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, ফিনল্যান্ড, সুইডেন এবং আইকেইএ ফাউন্ডেশনের মত সাতটি আন্তর্জাতিক সংস্থা একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।

ক্যাম্পগুলোতে শরনার্থী রোহিঙ্গারা স্বভাবতই মানবেতর জীবন যাপন করছে। বার্মিজদের অত্যাচারের ফলে নিদারুন মানসিক ও শাররীক ক্ষত তো আছেই। সেই সাথে পুস্টিকর খাবার, বাসযোগ্য বাসস্থান আর স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিস্কাশন সুবিধা বর্জিত রোহিঙ্গারা ক্রমাগত ডায়রিয়া, জন্ডিস সহ নানাবিধ রোগশোকে কাতর। ধর্ষিতা রোহিঙ্গা নারীদের অনেকেই গর্ভবতী এবং ক্যাম্পে বাল্য বিবাহ ছড়িয়ে পড়ায় গর্ভধারনের সংখ্যা আরো বাড়ছে। সেই সাথে এইডসের ঝুঁকিতেও আছে ভাসমান রোহিঙ্গা পতিতারা। শিক্ষা বঞ্চিত শিশুরা পাচারের হুমকিতে আছে, যুবকরা ইয়াবা পাচার সহ নানাবিধ অপকর্মের দিকে ঝুকছে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হিসেবে চলে যেতে তারা বিভিন্ন বৈধ ও অবৈধ পন্থা অবলম্বনের চেস্টা করছে।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের টেঙ্গার চরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা প্রস্তাব করে। কিন্তু তখন পরিকল্পনাটি মানবাধিকার সংস্থা এবং ইউএনএইচসিআর-এর আপত্তির কারনে কার্যকর হয়নি। সম্প্রতি নোয়াখালীর ভাসানচরের চারপাশে বাঁধ নির্মাণ করে সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্যে একটি বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। নকশা অনুযায়ী সেখানে ১,৪৪০টি ঘর বানানো হয়েছে, যার প্রতিটি ঘরে ১৬টা করে পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটা পরিবারে যদি চারজন করে সদস্য হয় তাহলে তাদের আলাদা একটা কক্ষ দেয়া হবে এবং তাদের জন্য আলাদা রান্নাবান্না ও টয়লেটের সুবিধাও রাখা হয়েছে। বন্যা বা জলোচ্ছাসের পানি ঠেকাতে বাড়িগুলো মাটি থেকে চার ফুট উঁচু করে বানানো হয়েছে। এখানে মানুষের উচ্ছিষ্ট থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেই গ্যাস দিয়েই চলবে রান্নাবান্না। এছাড়া বিদ্যুতের জন্য সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে। প্রতিটি স্থানে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের জন্য তিনটি বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেগুলো হল, ভূমি থেকে ৭২০ ফুট গভীর থেকে পানি উত্তোলন, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং পর্যাপ্ত পুকুর।

কিন্তু রোহিঙ্গারা নানান অজুহাতে ভাসানচরে যেতে আগ্রহী না। এছাড়াও আশংকা রয়ে যায় যে এই স্থানান্তরের ফলে মিয়ানমার ভাবতে পারে, বাংলাদেশেই যেহেতু রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে তাই তাদের আর ফেরত না নিলেও চলবে। যাহোক, রোহিঙ্গা শরনার্থীদের এসব বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে.২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন কর্ম পন্থা (Joint Response Plan) পেশ করা হয়। এ অনুযায়ী বারো লাখ রোহিঙ্গাদের জন্য প্রায় ৯২০.৫ মার্কিন ডলার অনুদান আশা করা হচ্ছে। এতে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের জীবনমানে হয়ত সামান্য উন্নতি আসবে, কিন্তু শক্তিশালী বিশ্ব জনমতের অভাবে এবং চীন-ভারতের মত প্রভাবশালী রাস্ট্রের অনীহার কারনে দেশ হারা রোহিঙ্গাদের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ আজো অনিশ্চিত।

This articles are also published on Roar Bangla:
https://roar.cm/rohingya-part1
https://roar.cm/rohingya-part2
https://roar.cm/rohingya-part3
https://roar.cm/rohingya-part4
https://roar.cm/rohingya-part5
https://roar.cm/rohingya-part6

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *