Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

১৯৮৯ সালে চিরচেনা বার্মাকে নতুন করে ‘মায়ানমার’ নামে অভিহিত করা হলো। রেঙ্গুনের নামও হয়ে গেল ‘ইয়াঙ্গুন।’ অবশ্য বার্মিজ ভাষায় আগে থেকেই ‘মায়ানমার’ (Myanma or Mranma Prañ) নামটি বার্মায় প্রচলিত ছিল। অনুষ্ঠানিক আর দাপ্তরিক বিভিন্ন লিখিত কাজে দেশটিকে ‘মায়ানমার’ নামেই ডাকা হত আর ‘বার্মা’ হল ‘মায়ানমার’ শব্দের অপভ্রংশ বা কথ্য/চলিত রূপ। বার্মা নামের সাথে ‘বামার’ গোত্রের নামের মিল থাকায়, আর বার্মা জুড়ে ১৩৫ টি স্বীকৃত নৃগোষ্ঠী থাকায়, সবার সমর্থন অর্জন করতে জান্তা সরকার বার্মার বদলে মায়ানমার নাম প্রচলনে আগ্রহী হয় বলে অনেকের ধারনা। আবার অনেকের মতে দেশের নাম সহ বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা দেশটির বৃটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাস থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। ২০০৫ সালে রেঙ্গুন (বর্তমানে ইয়াঙ্গুন) থেকে রাজধানীও স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়। প্রথমে পিন্মানা (Pyinmana) ও পরে ২০০৬ সালে নাইপেদো (Naypyidaw) তে মায়ানমারের নতুন রাজধানী স্থাপিত হয়।

যাহোক, বার্মার ব্যাপারে কমন তিনটা ন্যারেটিভ বিশ্ব বাজারে চালু আছে। এক, সামরিক জান্তাদের কারণে বার্মা যেহেতু একটি ‘ক্লোজড কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছিল তাই সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। দুই, অং সাং সুকি যেহেতু বছরের পর বছর নিজ গৃহে অবরুদ্ধ ছিলেন তাই মুক্তি পেয়ে এবার তিনি বার্মায় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে যা করার সব করবেন। তিন, দীর্ঘদিনের সামরিকতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে এইসব ছোটখাটো জাতিগত সংঘাত তো হতেই পারে। সমস্যা হল এই ন্যারেটিভ তিনটার সব কয়টাই ভুল এবং লোকদেখানো। তবে এই বিষয়ে আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করব। তার আগে চলুন আধুনিক বার্মার অবস্থাটা জেনে নেয়া যাক।

১৯৯০ সালের নির্বাচন ও অংসাং সুচির নোবেল লাভ
‘৮৮ র গন অভ্যুত্থানের কারনে এমনিতেই জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ছিল। তার উপর অং সাং সুকির উত্থান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষন করছিল বারবার। অতএব সেই ১৯৬০ সালের পর প্রথমবারের মত গত ২৭ মে ১৯৯০ সালে বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। ১৯৯০ সালের এই সাধারন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই ১৯৮৮ সালে ক্ষমতাসীন বার্মা সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি নাম বদলে ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি হয়ে গেল। সেই সাথে অং সাং সুকির নেতৃত্বে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) এর জন্ম হয়। এই নির্বাচনে অং সাং সুকির এনএলডি জয় লাভ করলেও আসলে লাভ তেমন হলো না। কারন ‘সংসদীয় গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা’ না বরং এই নির্বাচনের উদ্দেশ্যই ছিল নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন! তাই সামরিক জান্তা এই ফলাফলকে আদৌ পাত্তা না দিয়ে সুকিকে গৃহবন্দী করে রেখে ‘স্টেট পিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল’ এর মাধ্যমে দেশ চালাতে লাগল।

আধুনিক বার্মার প্রতিষ্ঠাতা অং সান কন্যা অং সান সু চি ১৯৪৫ সালের ১৯শে জুন রেঙ্গুনের (বর্তমান ইয়াঙ্গুন) হামওয়ে সাউং নামক একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সু চির মা খিন চি ছিল নবগঠিত বার্মা রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৪ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৯৬৮-তে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক অর্জন করার পর তিনি জাতিসংঘে তিন বছর কাজ করেন। ১৯৭২ সালে মাইকেল অ্যারিসকে বিয়ে করেন এবং তাদের দুই ছেলে হয়। ১৯৮৮-র গণআন্দোলনের সময় সু চি সবার নজর কাড়েন এবং ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) সাধারণ সম্পাদক হন। এই ডামাডলের মাঝেই ১৯৯১ সালে অং সাং সুকি পেয়ে গেলেন শান্তিতে নোবেল পুরুস্কার!

স্যাফরন রেভ্যুলুশন
নতুন সংবিধান প্রণয়নের কথা মাথায় রেখে ১৯৯৩ সালে জান্তা সরকার রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব অক্ষুন্ন রেখে সংসদ গঠনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ১৯৯৫ সালে এনএলডি ‘ওয়াক আউট’ করলে সেই প্রচেস্টা ভেস্তে যায়। অবশ্য নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই ককাং, ওয়া, কাচিন আর কারেন সহ বিভিন্ন বার্মিজ ইন্সার্জেন্টরা সামরিক জান্তাকে তটস্থ করে রাখে। জেনারেল খিন এর চেস্টায় এদের অনেকেই শান্ত হলেও কারেন বিদ্রোহীরা কোনোভাবেই সমঝোতায় রাজি হচ্ছিল না। অতএব ১৯৯৫ সালে ততমদো যুদ্ধ করে কারেন ঘাঁটি দখল করে নেয়। এভাবেই সারা বার্মা জুড়ে জান্তা সরকারের নিপীড়ন চলতেই থাকল।

গনতন্ত্রের প্রতি বার্মিজ জান্তা সরকারের অনীহা দেখে ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ বার্মার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও একই কাজ করে ২০০০ সালে। ২০০০ সালে অং সান সুকি ফের গৃহবন্দী হলেন যা ২০০২ সালে তুলে নেয়া হয়। ২০০৩ সালে তার গাড়ি বহরে হামলা চালায় দুস্কৃতিকারীরা। এই ফাঁকে জান্তা সরকার সুকির এনএলডি পার্টির উপর চড়াও হয় আরেক দফা। ২০০৩ সালের আগস্ট মাসে জান্তা সরকার সাত ধাপের একটি ‘রোড ম্যাপ টু ডেমোক্র্যাসি’ ঘোষনা করে, যদিও কবে নাগাদ এই রোড ম্যাপ বাস্তবায়ন হবে সে ব্যাপারে কিছু বলা হল না।

২০০৫ সালে এনএলডি সহ অন্যান্য বড় রাজনৈতিক দল গুলোকে বাইরে রেখে ছোট ছোট কিছু দলকে সাথে নিয়ে জান্তা সরকার আরেকবার সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা করে। একই সাথে রেঙ্গুন থেকে রাজধানী সরানোর কাজও শুরু হয়। অবশেষে ২৭ মার্চ ২০০৬ তারিখে ‘নাইপেদো’ বার্মার নতুন রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে আইএলও ঘোষনা দিল যে তারা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসে মায়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে যাচ্ছে। আইএলওর মতে জান্তা সরকার আট লক্ষ বার্মিজ নাগরিককে নিজেদের স্বার্থে জোর করে কাজ করাচ্ছে।

২০০৭ সালে তেলের দামের উপর জান্তা সরকার ভর্তুকি তুলে নিলে বার্মা ফের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠল। বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও এতে যোগ দিলে ইতিহাসে তা ‘স্যাফরন রেভুলুশন’ নামে খ্যাতি পায়। জান্তা সরকার যথারীতি সামরিক কায়দায় গুম খুন করে এই বিক্ষোভ দমাতে চেষ্টা করে এবং ব্যর্থ হয়। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘোষণা আসে গণভোটের যা অনুষ্ঠিত হবে ২০১০ সালে।

নার্গিস তান্ডব এবং স্টেট কাউন্সেলর সুচি
২০০৮ সালের ০৩ মে সাইক্লোন ‘নার্গিস’ বার্মায় আঘাত হানে। প্রলয়ংকারী এই ঘুর্নিঝড়ে পুরো বার্মা তছনছ হয়ে যায়। প্রায় এক লাখ ত্রিশ হাজার লোক প্রাণ হারায় আর দশ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু জান্তা সরকার কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক ত্রান দেশে ঢুকতে অস্বীকৃতি জানায় যা জাতিসংঘ ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যায়িত করে। এরপরই মূলত জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সহানুভূতি হারিয়ে ফেলে। চাপের মুখে ২০১০ সালে তারা অং সান সুকিকে মুক্ত করতে এবং তার সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। উৎসাহ দিতে ০১ ডিসেম্বর ২০১১ হিলারি ক্লিনটন বার্মা সফরে আসেন। তার এক বছর পর আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

জান্তা সরকার আইন সংশোধন করলে ২০১২ সালের উপ নির্বাচনে সুকির এনএলডি পার্টি অংশ নেয় এবং ব্যাপক সংখ্যা গরিষ্ঠতায় জয় লাভ করে। আর ০৮ নভেম্বর২০১৫ সালের সাধারন নির্বাচনেও এনএলডি একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী বৃটিশ স্বামী আর দুই সন্তানের কারনে এবং সামরিক চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকার কারনে সুকির পক্ষে প্রেসিডেন্ট হবার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু নবগঠিত সরকারে সুকির ক্ষমতা অটুট রাখতে তার জন্য স্টেট কাউন্সেলর অফ মায়ানমার পদটি সৃষ্টি করা হলো। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে। আর মায়ানমারের নবম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পেলেন থিন কিও (Htin Kyaw) যিনি মায়ানমারের প্রথম অসামরিক প্রেসিডেন্টও বটে।

ক্লিঞ্জিং অপারেশন
এদিকে সর্বশেষ রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়ে গিয়েছিল ২০১৬ সালের শেষভাগে। ‘ক্লিঞ্জিং অপারেশন’ নামে পরিচিত এই অভিযানে অংশ নেয় মায়ানমার সেনাবাহিনী (ততমদো) এবং পুলিশ। ১৯৪৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গাদের সমূলে উচ্ছেদ করার নীলনকশার চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে উত্তর-পশ্চিম রাখাইনে বার্মিজ বৌদ্ধ উগ্রবাদিদের সহযোগে এই নৃশংস অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। অমানবিক এই অভিযানের বিরুদ্ধে সারা বিশ্ব নিন্দা জানালেও মায়ানমার সরকার যথারীতি এসব তথ্য-প্রমানকে ‘অতিরঞ্জন’ বলে অস্বীকার করে। এসময় ততমদোর নৃশংসতা রোধে শান্তিতে নোবেল জয়ী নেত্রী অং সান সুকির নির্বিকার ভূমিকাও সারাবিশ্বে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। 

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে এই অভিযানের তীব্রতা দারুনভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রায় দশ হাজার রোহিঙ্গাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয় যেন বাকিরা আতংকিত হয়ে পালানো শুরু করে। সেই সাথে বৌদ্ধ উগ্রবাদিদের সাথে নিয়ে ততমদো আর পুলিশ মিলে ব্যাপক লুটপাট ও গন ধর্ষন শুরু করে। ৩৯২ টি রোহিঙ্গা গ্রাম আগুনে পুরিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। বার্তা সংস্থা রয়টারের দুই সাংবাদিক এসব সংবাদ প্রচারের চেষ্টা করলে তাদের কারাগারে পাঠানো হয় এবং ৭ বছরের জেল হয়। জাতিসংঘ সহ বিশ্বের সকল মানবাধিকার সংস্থা ও গণ মাধ্যম একে ‘আ টেক্সটবুক একজাম্পল অফ এথনিক ক্লিঞ্জিং’ এবং ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ধিক্কার জানায়। এই নিষ্ঠুর অভিযানের ফলে প্রাণ ভয়ে প্রায় সাত লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। মুসলিম রোহিঙ্গাদের এমন দুঃসময়ে নোবেল জয়ী নেত্রী সুকির নিরবতায় আরো একবার সারাবিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠে।

২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে মায়ানমার সরকার বাংলাদেশ সরকারকে আশ্বাস দেয় যে দুই মাসের ভেতর রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেয়া হবে। যাহোক, ২০১৮ সালের মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট থিন কিওকে সরিয়ে দেয়া হয় এবং অং সাং সুকির পুতুল প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান উইন মিন্ট। ২০১৮ সালের আগষ্ট মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে ততমদো জেনারেলদের বিচারের দাবি জানায়। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুসলিম রোহিঙ্গা গনহত্যায় যোগসাজস আছে সন্দেহে কানাডা সরকার অং সাং সুকির সম্মানসূচক কানাডিয় নাগরিকত্ব বাতিল করে। মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলিম জেনোসাইডের সকল চিহ্ন সরিয়ে ফেলতে রাতদিন চেষ্টা করে যাচ্ছে। সম্প্রতি ২০১৯ সালের ২১ জুন মায়ানমার সরকারের নির্দেশে সারা রাখাইনে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।

আধুনিক বার্মাকে জানুন
অং সান সুকির সরকার কী লুকাতে চাইছে আর কেনই বা লুকাতে চাইছে তা আমরা পরের অধ্যায়ে জানব। তার আগে চলুন জেনে নেয়া যাক আধুনিক মায়ানমার সম্পর্কে।

মায়ানমারের অফিশিয়াল নাম রিপাবলিক অফ দ্য ইউনিয়ন অফ মায়ানমার। রাজধানী নাইপেদো (Naypyitaw), সরকারী ভাষা বর্মী (Burmese) আর মুদ্রার নাম কিয়াত (Burmese kyat)। দেশটিতে সামরিক বাহিনী সমর্থিত গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান। বর্তমান (২০১৯) রাষ্ট্রপতি থেইন কিয়াও এবং উপরাষ্ট্রপতি সাই মাউক খাম। তবে সর্বময় ক্ষমতা স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি র হাতে, এই পদটি প্রধানমন্ত্রীর সমমানের। দেশটি ২০১২ সালের ট্রানপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৭৬ টি দেশের মধ্যে দুর্নীতিতে ১৭১তম।

 দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির পশ্চিমে আছে ভারতের মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুনাচল প্রদেশ এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগ। পূর্বে থাইল্যান্ড ও লাওস, এবং উত্তর ও উত্তরপুর্বে আছে চীন। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের পাশে মায়ানমারের আছে প্রায় ১২০০ মাইল দীর্ঘ উপকূল। দেশটির মোট আয়তন ৬,৭৬,৫৭৪ বর্গ কিঃমিঃ আর জনসংখ্যা প্রায় ৫৪ মিলিয়ন (২০১৭ আদমশুমারি অনুযায়ী)। কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশ না হলেও ১৯৯৭ সাল থেকে দেশটি আসিয়ানের সদস্য। 

ভূমিঃ
ইরাবতি আর সিতং নদীর মোহনায় মায়ানমার দেখতে অনেকটা লেজ ওয়ালা ঘুড়ির মত। উত্তর থেকে মায়ানমারের দৈর্ঘ্য প্রায় ২,০৫০ কিঃমিঃ আর প্রস্থে ৯৩০ কিঃমিঃ। গ্রাম প্রধান এই দেশটিকে পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়। উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল যেখানে কাচিন স্টেটে অবস্থিত মাউন্ট হাকাবো (Mount Hkakabo) দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, পশ্চিমা পার্বত্য অঞ্চল, পূর্বের উপত্যকা অঞ্চল, দেশের মধ্যভাগের বেসিন ও নিম্নাঞ্চল, এবং উপকূলীয় সমভূমি। দেশের অর্ধেকের বেশি এলাকা বন জঙ্গলে ভরা। উত্তরে হেংদুয়ান পর্বতমালা (Hengduan Mountains) চীন থেকে বার্মাকে আলাদা করেছে। ইরাবতি (Irrawaddy) বার্মার দীর্ঘতম নদী (২,১৭০ কিঃ মিঃ দীর্ঘ), এছাড়াও সালউইন (Salween/Thanlwin) আর সিতাং (Sittaung) দেশটির অন্যতম নদী। 

নৃগোষ্ঠীদের ভিত্তিতে প্রশাসনিকভাবে মায়ানমার সাতটি প্রদেশ বা বিভাগে বিভক্ত (চিন, কাচিন, কায়িন বা কারেন, কায়াহ, মন, রাখাইন বা আরাকান, এবং শান)। নিম্নে ছক আকারে এই প্রদেশসমুহের উপাত্ত উপস্থাপন করা হলোঃ 

No.State/RegionDistrictsTownshipsCities/TownsWardsVillagegroupsVillages
1Kachin State418201166062630
2Kayah State2772979624
3Kayin State3710463762092
4Chin State299294751355
5Sagaing Region8373717117696095
6Tanintharyi Region31010632651255
7Bago Region4283324614246498
8Magway Region5252616015434774
9Mandalay Region7312925916115472
10Mon State21011693811199
11Rakhine State4171712010413871
12Yangon Region445206856342119
13Shan State115454336162615513
14Ayeyarwady Region62629219191211651

Total6332431225481374265148

জলবায়ুঃ
মায়ানমারের উপর দিয়ে মৌসুমি বায়ু বয়ে গেলেও উত্তরের পার্বত্যাঞ্চলে বছরে দুই মাস তুষারপাত হয়। ঋতু মূলত তিনটিঃ অক্টোবরের শেষভাগ হতে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল, মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য মে পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল, আর বাকি সময় বর্ষা।

মানুষঃ
মায়ানমারে ১৩৫ টি ধর্ম-বর্ন-গোত্রের লোক বাস করে। বার্মানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কারেনরা মোট জনসংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ। ছাড়াও আছে কায়া, শান, মন, নাগা, চিন, কাচিন ইত্যাদি গোষ্ঠি বা গোত্র। তবে মুসলমান হবার কারনে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়ে থাকে। বার্মার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির পরিসংখ্যান নিম্নরূপঃ

মায়ানমারের জনসংখ্যার ৬৮% বামার, ১০% শান, ৭% কাইন, এবং ৪% রাখাইন। এছাড়াও আছে মন, কাচিন, কারেন, চিন, রোহিঙ্গা, এংলো ইন্ডিয়ান, গুর্খা, নেপালি এবং এংলো বার্মিজ সহ অন্যান্য সংখ্যা লঘু গোষ্ঠী। সামরিক জান্তা বার্মানাইজেশন (Burmanisation) নীতি অনুসরন করে ধীরে ধীরে সংখ্যা লঘুদের নিজস্বতাকে হরন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। জান্তাদের অত্যাচারে দেশ্ছাড়া হয়ে বহু বার্মিজরা থাইল্যান্ড, ভারত, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শরনার্থী শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে মায়ানমারে শিক্ষার হার বেশ উঁচু। বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১০০ টির উপর। যদিও ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘে স্বল্পোন্নত দেশ (least developed country) হিসেবে স্বীকৃতি পেতে শিক্ষার হার ৭৯% এর বদলে ১৯% দেখিয়েছিল। রাষ্ট্র ধর্ম বলে কিছু না থাকলেও দেশটির ৮৫% এর বেশি মানুষ বৌদ্ধ (Theravada Buddhism) ধর্মাবলম্বী। এছাড়াও মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টানরাও আছে তবে সরকারি চাকরিতে তাদের সুযোগ পাওয়ার উদাহরন বিরল।

Myanmar: Religious affiliation



অর্থনীতিঃ
অন্ত্ররজাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্নতা ও আভ্যন্তরীন অব্যবস্থাপনার কারনে মায়ানমার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দরিদ্র দেশ। অনুন্নত অবকাঠামো আর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনেও দেশটি পিছিয়ে আছে। ২০১২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল। তবে সম্প্রতি ভারত ও চীন মায়ানমারে বিপুল বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। কৃষি নির্ভর অর্থনীতির মায়ানমার চাল রপ্তানীকারক দেশ। এছাড়াও বিশ্বের ২য় বৃহত্তম গাজা ও হিরোইন উৎপাদক। বিশ্বের ৯০% রুবি পাথর এখানে পাওয়া যায়। সাথে আছে স্যাফায়ার, জেড পাথর আর মুক্তা। মান্দালয়ের উত্তরে মগক এলাকায় পাওয়া যায় কবুতর রক্ত লাল রুবি আর নীল স্যাফায়ার পাথর। এছাড়াও কাঠ-বেতের আসবাবপত্রও রপ্তানী হয়। অর্থনীতির সবক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের অবাধ নিয়ন্ত্রন বিদ্যমান। সম্ভবত সেকারনেই, সাধারন জনগনের জীবন যাত্রার মান করুন হলেও সামরিক অফিসারদের প্রাচুর্য চোখে পরার মতই। সেই সাথে আছে বিদ্রোহীদের কঠোরভাবে দমনের জন্য সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের নামে কোটি কোটি টাকার সমরাস্ত্র কিনবার লালসা!

সশস্ত্রবাহিনীঃ
মায়ানমার সশস্ত্রবাহিনীকে ততমদো (Tatmadaw) বলা হয়ে থাকে। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রায় ৮ লাখ ৮৮ হাজার সেনা সমৃদ্ধ ততমদো বিশ্বের ১২ তম বৃহত্তম সেনাবাহিনী। একসময় ৪০ ডলার সমমানের কিয়াত আর এক বস্তা চাল বা এক ক্যান পেট্রোলের বিনিময়ে শিশুদের কিনে নিয়ে সৈনিক হিসেবে ততমদোতে ভর্তি করা হত। তবে বর্তমান ততমদোর বাজেট সম্পর্কে কোনো পরিস্কার ধারনা পাওয়া যায় না। রাশিয়া, ইউক্রেন, চীন, ভারত ও পাকিস্তান হতে প্রতি বছর বিপুল পরিমান সমরাস্ত্র ক্রয় করে ততমদোকে আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে। পিন ও লিন (Pyin Oo Lwin) এর সন্নিকটে রাশিয়ার সহায়তায় দেশটি নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর নির্মান করছে। এছাড়াও ২০১০ সালে উইকিলিক্স থেকে পাওয়া তথ্য মতে তারা উত্তর কোরিয়ার সহায়তায় ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল কারখানা নির্মান কছে বলে ধারনা করা যায়। 

অভ্যন্তরীন কোন্দল নিরসনে ও বিরোধীদের দমাতে ততমদো সদা তৎপর ও অগ্রণী ভূমিকা রেখে থাকে। রাষ্ট্র যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ন পদ সমুহ ততমদো জেনারেলরাই অলংকৃত করে থাকেন। কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি অপারেশনে সুদক্ষ ততমদো রোহিঙ্গা নিধনে ও নিশ্চিহ্ন করনে ধর্ষনসহ নানাধরনের অমানবিক পদ্ধতি উদ্ভাবন ও প্রয়োগে ব্যাপক পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছে এবং বেশ কয়েকজন ততমদো জেনারেল বর্তমানে এথনিক ক্লিঞ্জিং এর দায়ে আন্তর্জাতিকভাবে অভিযুক্ত।

পরের পর্বঃ
https://delhkhan.com/%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be-%e0%a6%b0%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%83-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%99/

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

2 thoughts on “রোহিঙ্গা রঙ্গ-তিনঃ বার্মা থেকে মায়ানমার-আধুনিক বার্মার ইতিহাস (১৯৮৮-২০১৯)”

  1. Md. Nizam Uddin

    অবসরে গেলে ভূগোলের প্রফেসর হতে পারবেন।

    1. মাশাল্লাহ! সে তো দারুণ সম্মানের ব্যাপার হবে। অসংখ্য ধন্যবাদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *