Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

আলুংপায়া (Alaungpaya) রাজ বংশ- ১৭৫২-১৮৮৫
বার্মার কঙবং রাজ বংশের আরেক নাম ছিল আলমপারা বা আলুংপায়া (Alaungpaya) রাজবংশ। ১৭৫২ সালে জনপ্রিয় বার্মান নেতা আলুংপায়া (শাসনকাল ১৭৫২-৬০) উত্তর বার্মা থেকে বাগো বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে শানদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করে আলুংপায়া রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৫৯ সালের ভেতর তিনি মনিপুর দখল করে নেন এবং বাগোদেরও পরাস্ত করেন। এরপর তিনি দক্ষিণে রাজ্য বিস্তার শুরু করেন এবং ১৭৬০ সালে সিয়ামিজ অভিযান চলাকালে নিহত হন। কিন্তু তার পুত্র সিনবায়ুসিন (Hsinbyushin) রাজ্য বিস্তার অব্যহত রাখেন। বার্মার এই উত্থানে চীনা শাসকেরা ঈর্ষান্বিত হয়ে চারবার বার্মা দখলের পায়তারা করেও ব্যর্থ হয়। 

এরপর আলুংপায়ারা রাখাইন আর আসাম দখল করে নেয়। আর এর ফলেই ভারতের উপনিবেশিক শাসক বৃটিশ রাজের মুখোমুখি হয় বার্মা রাজ বাজিদো, যিনি সাগাইন মিন (Sagaing Min) নামেও সমাধিক পরিচিত! ফলাফল ১ম এংলো-বার্মিজ যুদ্ধ। মনিপুর, আসাম সহ উত্তরপূর্ব ভারতীয় সীমান্ত নিয়ে এই এংলো-বার্মিজ বিরোধ শুরু হয় ১৮২২ সালে এবং ১৮২৪ সালের মার্চ মাসের ৫ তারিখে শুরু হয় ১ম এংলো-বার্মিজ যুদ্ধ। দুই বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে খরুচে যুদ্ধ। যুদ্ধে সিয়ামিজরা বৃটিশদের পক্ষ অবলম্বন করে। ফলে বার্মা রাজ বাধ্য হয় বৃটিশ রাজদের সাথে সন্ধি করতে। সন্ধিচুক্তি অনুযায়ী আসাম, মনিপুর, রাখাইন আর তেনাসেরিম বার্মিজদের হাতছাড়া হয়। 

যাহোক, এরপর বাগো এলাকার বনাঞ্চল (teak forests) আর কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন উপকূল দখলের উদ্দেশ্যে বৃটিশরা ২য় এংলো-বার্মিজ যুদ্ধে প্ররোচনা দেয়।  এই যুদ্ধে বৃটিশরা ১৮৫২ সালে বাগো প্রদেশ দখল করে একে লোয়ার বার্মা হিসেবে নামকরণ করে। বার্মা রাজের রাজ্য ততদিনে স্রেফ উত্তর বার্মায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এরপর বৃটিশরা চীনের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে এবং বার্মার কাঠ, তেল আর রুবি পাথরের দখল পেতে আরেকটি যুদ্ধের অজুহাত খুঁজতে থাকে। অবশেষে ১৮৮৫ সালে বৃটিশরা অবশিষ্ট বার্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অজুহাত হিসেবে তারা দাবী করে যে বার্মার রাজা থিবো ছিলেন এক অত্যাচারী শাসক এবং তিনি গোপনে ফরাসিদের সাথে হাত মিলিয়েছেন বার্মা থেকে বৃটিশদের উচ্ছেদ করার অভিপ্রায়ে। ঠিক একই কৌশলে বৃটিশরা ১৭৫৭ সালে বাংলার নবাব সিরাজ উদ দৌলাকেও উৎখাত করেছিল।  ১৮৮৫ সালে ২২ দিনের তৃতীয় অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধেও বার্মিজরা হেরে যায় এবং সমগ্র বার্মা ব্রিটিশদের দখলে চলে আসে। 

ব্রিটিশ কলোনি হিসেবে বার্মার নাম ছিল ব্রিটিশ বার্মা। রাজধানী ছিল রেঙ্গুন। ব্রিটিশ-ভারতীয় উপনিবেশের একটি প্রভিন্স হিসেবে ৮টি ডিভিশনে ভাগ করে বার্মা শাসন করতো ইংরেজরা। উপনিবেশিক শাসনের শুরুতেই রাজতন্ত্র এবং বৌদ্ধ সংঘগুলো বিলুপ্ত করা হয়। এর ফলে রাজকীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সেনাসদস্যদের সহায়তায় দেশ জুড়ে বিক্ষোভ আর গরিলা সংগ্রামের সুত্রপাত হয়। ইংরেজরা এ সময় দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে স্ট্রেটেজিক হেলমেট (strategic hamlet) নীতি অনুসরন করে গ্রামের পর গ্রাম উজার করে নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করে।

বার্মিজ রাজতন্ত্রে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ছিল। কিন্তু ইংরেজরা এসে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হস্তক্ষেপ একেবারেই বন্ধ করে দেয়। উপরন্তু বৃটিশদের ধর্ম নিরপেক্ষ স্কুল স্থাপনের পাশাপাশি খ্রিস্টান মিশনারি ধর্ম প্রচারকদের ইন্ধনে সমাজে ভিক্ষুদের প্রভাব ও সম্মান খর্ব হতে থাকে। আবার বৌদ্ধদের চেয়ে আরাকানি মুসলিম আর কারেন খ্রিস্টানদের প্রতি ইংরেজদের আস্থা ছিল বেশি। অন্যদিকে উপনিবেশিক অর্থনীতির চাপে আবহমান বার্মিজ অর্থনীতি ব্যবস্থাও ধ্বসে যায়।  ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল খুলে যাবার পর বার্মিজ চাল রপ্তানীর লক্ষ্যমাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে বার্মার নিম্নাঞ্চল জুড়ে ব্যাপক ধান চাষ শুরু হয়। তবে উপনিবেশ হিসেবে বার্মার চাল, কাঠ, তেল আর রুবিসহ সব ব্যবসা বানিজ্যই বৃটিশদের কুক্ষিগত ছিল বিধায় বার্মিজ জনগন দিনদিন হতদরিদ্র হতে থাকে।   

নতুন স্কুল আর মিশনারিগুলোতে শিক্ষিত বার্মিজরা বৃটিশ শাসনযন্ত্রে করনিক পদ সমুহে যোগ দিতে থাকে। তবে বার্মায় বিজ্ঞান অধ্যয়নের সুযোগ না থাকায় প্রশাসনের উচ্চতর পদে ভারতীয়দের সাথে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ছিল। রেঙ্গুনের লিবারেল আর্ট কলেজের কিছু ছাত্র বিলেতে আইন পড়তে গিয়ে ফিরে এসে বার্মায় নতুন ধারার স্থানীয় নেতৃত্ব গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন। এক্ষেত্রে তারা আবহমান বার্মার বৌদ্ধ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আশ্রয়ে দ্রুত শক্তি সঞ্চয়ের আশায় ১৯০৬ সালে ‘ইয়ং ম্যানস বুদ্ধিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’ এর গোড়াপত্তনের মধ্য দিয়ে বার্মায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল। 

১৯২০ সাল রেঙ্গুন কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। কিন্তু এর শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বার্মিজরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে ‘ইয়ং ম্যানস বুদ্ধিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’ এর স্থাপিত স্কুল সমুহ জাতীয় স্কুল হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে এবং ভিক্ষুদের হৃত গৌরব ফিরে আসতে শুরু করে।  ১৯২৩ সালের পর থেকেই বার্মায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন (Thakin movement) দানা বাধতে শুরু করে । ১৯৩০ সালে বৃটিশ বিরোধী বার্মিজদের স্বঘোষিত রাজা সায়া সানের নেতৃত্বে বার্মায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটে। ১৯৩২ সালে সায়া সান সহ ১২৫ জনের ফাঁসি দিয়ে বৃটিশরা সাময়িকভাবে এই আন্দোলন দমাতে সমর্থ হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা
১৯৩৬ সালে রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন এর নেতা অংশ এবং কো নু কে বহিষ্কারের জের ধরে ছাত্র বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় এবং অল বার্মা স্টুডেন্ট ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশরা বার্মা কে ভারত হতে আলাদা করে দেয়। কিন্তু এতে বার্মিজদের মনে ব্রিটিশদের অভিসন্ধি নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধে এবং কিছু কিছু বার্মিজ নেতা জাপানিজদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। সেইসাথে শুরু হয় রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রীক ছাত্র আন্দোলন আর ব্রিটিশদের উপনিবেশিক প্রভুদের ধরপাকড়। চীনের প্রত্যক্ষ মদদে রেঙ্গুনে অং সাং সহ সাত সহযোগীর উপস্থিতিতে কমিউনিস্ট পার্টি অফ বার্মা (সিপিবি) প্রতিষ্ঠিত হয়। 

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার বার্মিজরা অং সাং এর নেতৃত্বে বৃটিশদের সাথে দর কষাকষি করার চেষ্টা করে। ক্ষিপ্ত বৃটিশ রাজ অং সাং এর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে প্রথমে সে চীনে পালিয়ে যায়। পরে ফিরে এসে আরো ২৯ জন ছাত্র নেতা সহ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে জাপান কর্তৃক দখলকৃত তাইওয়ানে গমন করেন। ইতিহাসে এরাই ‘দ্য থারটি কমরেডস (Thirty Comrades) নামে পরিচিত এবং এদের হাত ধরেই জাপানিদের সহায়তায় ১৯৪১ সালে বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি গড়ে ওঠে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে।

১৯৪২ সালে জাপানিরা বার্মা দখলের এক বছরের মাথায় বার্মিজদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়।  এরই ধারাবাহিকতায় বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি শুরুতে জাপানিদের সাথে একযোগে বৃটিশদের সাথে লড়তে শুরু করে। আরাকানে বৃটিশদের অনুগত রোহিঙ্গাদের উপর ১৯৪২ সালে বার্মা ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি যে ব্যাপক নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তাতে তারা দলে দলে উত্তর আরাকানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। অবশ্য উত্তরের কারেন আর কাচিনরা শুরু থেকেই বৃটিশদের হয়ে জাপানীদের বিরুদ্ধে লড়তে শুরু করেছিল।  ১৯৪৩ সালে জাপানিরা বার্মার স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং বার্মা ডিফেন্স আর্মি নাম পরিবর্তন করে বার্মার ন্যাশনাল আর্মি তে পরিণত হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ ভাগে জাপানিদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে লর্ড মাউন্টব্যাটেন এর সঙ্গে হাত মেলায় অং সাং এবং পক্ষ পরিবর্তন করে বৃটিশদের সাথে একযোগে লড়ে জাপানীদের বার্মা থেকে বিতারিত করে।

অংসান এর মৃত্যু এবং বার্মার স্বাধীনতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানীদের সাথে হাত মেলানোর অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার অং সাং এবং তার সহযোগীদের বিচার করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। বার্মার স্বাধীনতার প্রশ্নে বৃটিশদের গরিমসির এক পর্যায়ে ২৮ জানুয়ারি ১৯৪৭ তারিখে লন্ডনে অংসাং-আতিলি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং বার্মার স্বাধীনতা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে পানলং কনফারেন্সের মাধ্যমে অং সাং বার্মার অধিকাংশ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীদের সমর্থন নিশ্চিত করেন। একই সময়ে ভিক্ষু ইউ সেইনদার নেতৃত্বে আরাকানে বিদ্রোহ শুরু হলেও অংসাং এবং তার পার্টির জনপ্রিয়তার মুখে এসব চাপা পড়ে যায়। কিন্তু  ১৯ জুলাই ১৯৪৭ তারিখে অংসাং আততায়ীদের হাতে নিহত হন। এমতাবস্থায় ‘দ্য থারটি কমরেডস’ এর আরেক কমরেড থাকিন নু ওরফে উ নু দলের হাল ধরেন এবং ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। যদিও তারা কমনওয়েলথ ভুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানায়।

১৯৪৮-৬২
স্বাধীনতার পরপরই রেড ফ্ল্যাগ কম্যুনিস্ট, হোয়াইট ফ্ল্যাগ কম্যুনিস্ট, আরাকানিজ মুসলিম আর কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের সদস্যরা বার্মা জুড়ে অস্থিরতা আর অন্তর্ঘাত চালাতে শুরু করে। এসব দল গুলোর নেতৃত্বে ছিল ‘দ্য থারটি কমরেডস’ এর প্রাক্তন কমরেডরাই। কম্যুনিজমের বিরুদ্ধে বার্মার এই লড়াইয়ে বৃটেন ও অন্যান্য কমনওয়েলথ দেশ অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা দিতে থাকে।  এসব সহায়তায় বার্মার সেনাবাহিনী শক্তি সঞ্চয় করে এবং ১৯৫৪ সালের ২৭ মার্চ বার্মা ন্যাশনাল আর্মির নতুন নাম হয় তাতমাদো। তাতমাদোর অব্যহত চাপে ১৯৫৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অফ বার্মা (সিপিবি) আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে বাধ্য হয় এবং কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মির সাথে যোগ দেয়। 

এই ডামাডোলের মাঝে ১৯৬২ সালে  জেনারেল নে উইন ক্ষমতায় আসেন। বার্মিজরা দাবী করে উ নু সেনাপ্রধান নে উইনের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলেন, তবে আন্তর্জাতিক ভাষ্য মতে এটা আসলে ক্যু ছিল। ০৮ জুলাই ১৯৬২ সালে নে উইন বিরোধী ছাত্র সমাবেশে গুলি চালায় এবং রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন ভবন গুড়িয়ে দেয়। এমতাবস্থায় চীনের সহায়তায় কমিউনিস্ট পার্টি অফ বার্মা (সিপিবি) ফের চাঙ্গা হয়ে উঠে। ১৯৬৩ সালে নে উইন সকল দলের সাথে শান্তি আলোচনার ডাক দেন কিন্তু তার নিজের একগুয়েমির কারনে তা ভেস্তে যায়। বরং তিনি ইউনিয়ন অফ বার্মা ধারনার বদলে এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম তত্বে অনড় থাকেন।  এতে কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন, কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স অর্গানাইজেশন এবং শান স্টেট আর্মির মত বিরোধী আর বিদ্রোহী দলগুলো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। 

১৯৬৪-৮৮
২৮ মার্চ ১৯৬৪ সালে নে উইন সরকার বার্মায় সকল বিরোধীদল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে উ নুও পার্লামেন্টারি ডেমক্র্যাসি পার্টি গঠন করেন। অন্যদিকে সান, কারেন আর কাচিন বিদ্রোহীদের পেছনে চীনা মদদ খর্ব করতে নে উইন সরকারের প্ররোচনায় ১৯৬৭ সালে রেঙ্গুনে চীন বিরোধী দাঙ্গায় চীনা দূতাবাস আক্রান্ত হয়। জবাবে চীন বিদ্রোহীদের জন্য সহায়তার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। এতে সিপিবি, সান ও কারেনদের যৌথ আক্রমনের মুখে তাতমদো পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং দেশের উত্তর-পূর্বাংশের উপর নিয়ন্ত্রন হারায়। সিপিবি সমর্থিত সেই মুক্তাঞ্চলে চীন একটি বিদ্যুতকেন্দ্রও গড়ে দেয়। কিন্তু এই অবস্থায় নে উইন তার কৌশল পরিবর্তন করে একে একে সিপিবি নেতাদের হত্যা করে দলটিকে দুর্বল করে দেয় এবং সত্তর দশকের শেষভাগে মধ্য বার্মার পূর্ন নিয়ন্ত্রন পুনরুদ্ধার করেন। 

নে উইন বার্মাকে একটি সোশালিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বার্মা সোসালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি গঠন করেন।  ১৯৭২ সালে নে উইন সহ ইউনিয়ন রেভুলিশনারি কাউন্সিলের সকল সেনা সদস্য সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহন করেন। ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে নতুন সংবিধান প্রনয়ন করে পিপলস এসেম্বলি গঠন করা হয় এবং নে উইন হন নতুন সকারের রাষ্ট্রপতি।  

১৯৭৪ সালের মে মাসে দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি আর খাদ্য সংকটের প্রতিবাদে রেঙ্গুনে লাগাতার ধর্মঘট শুরু হলে জান্তা সরকার শ্রমিকদের উপর গুলি চালিয়ে তা বন্ধ করে। কিন্তু একই বছরের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের বার্মিজ মহাসচিব উ থান্টের মৃত্যুর পর তাকে রাস্ট্রীয় সম্মানে সমাহিত না করায় সারা দেশে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে। উল্লেখ্য যে, উ থান্ট ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী উ নুর ঘনিষ্ট সহযোগী আর বার্মার জান্তা সরকারের প্রতিপক্ষ স্বরূপ। ১৯৭৬ সালে নে উইন এবং সান ইউকে হত্যার ষড়যন্ত্র করায় একজন ক্যাপ্টেনের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। 

১৯৭৮ সালে আরাকানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন কিং ড্রাগন’ পরিচালনা করা হয়।  ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত (৫মাস ৩ সপ্তাহ ৪দিন) চলা এই অপারেশনে বার্মিজ ইমিগ্রেশন অফিসারদের সাথে নিয়ে ততমদো এমন নৃশংসতা চালায় যে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি ফেলে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। 

 ১৯৮১ সালে নে উইন প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অবসর নিলেও ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি বার্মা সোসালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টির চেয়ারম্যানের পদ আঁকড়ে ধরে থাকেন। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেনারেল সান ইউ দায়িত্ব গ্রহন করেন যদিও মূল ক্ষমতা রয়ে যায় নে উইনের হাতেই। ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কুসংস্কার বশত নে উইন বার্মায় প্রচলিত কিছু কিয়াত (বার্মিজ ব্যাঙ্ক নোট) বাতিল করে দেন। ৯ কে নিজের লাকি নাম্বার মনে করতেন বলে ১০০, ৭৫, ৩৫, ২৫ কিয়াতের নোট বাতিল করে দিয়ে শুধুমাত্র ৯ দ্বারা বিভাজ্য ৪৫ এবং ৯০ কিয়াতের নোট চালু করলেন। মগের মুল্লক আর কাকে বলে!

৮৮৮৮ আন্দোলন
কিয়াতের এই সংস্কারের ফলে রেঙ্গুনে ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে; সাথে মান্দালয়ের বৌদ্ধ ভিক্ষু আর সাধারন শ্রমিকেরাও। নিরুপায় হয়ে সরকার সব স্কুল কলেজ ছুটি দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ১৯৮৮ সালের মার্চ মাস থেকে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে আবার বিক্ষোভ দানা বাধতে থাকে। ক্রমশ বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পরতে শুরু করলে ২৩ জুলাই ১৯৮৮ তারিখে নে উইন পার্টির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন।  ২৭ জুলাই সান ইউ ও প্রেসিডেন্ট পদে ইস্তফা দিলে ১৭ দিনের জন্য নতুন প্রেসিডেন্ট হন ‘রেঙ্গুনের কসাই’ বলে কুখ্যাত জেনারেল সেইন লিন। 

৮ আগস্ট ১৯৮৮ তারিখে জান্তা সরকারের পতন ঘটিয়ে গনতন্ত্র কায়েমের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপি গন বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। জান্তা সরকারও কঠোর অবস্থান গ্রহন করে। শুরু হয় দেশ ব্যাপী সংঘর্ষ। ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ পর্যন্ত চলা এই বিক্ষোভে ৩০০০ থেকে ১০,০০০ বার্মিজ প্রাণ হারায়। যদিও সরকারী পরিসংখ্যান মতে এই সংখ্যা ৩৫০ জন। ঠিক এই সময় অং সাং সুচি তার অসুস্থ মায়ের সেবায় ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষিত আর রাজনীতিবিদ পিতামাতার সুযোগ্য সন্তান হিসেবে তিনি সুযোগ চিনতে ভুল করেননি। ২৬ আগস্ট তারিখে তিনি সেদাগন প্যাগোডায় লাখ লাখ জনতা উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ন উপায়ে বিক্ষোভ পরিচালনার ডাক দিয়ে হয়ে গেলেন বার্মিজ গনতন্ত্রের মানস কন্যা! 

যাহোক, ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ তারিখে জেনারেল স মং ক্যু করে ক্ষমতা দখল করে দেশে স্টেট ল এন্ড অর্ডার রেস্টোরেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে জরুরী অবস্থা জারি করলেন। দাতা দেশ আর জাতিসংঘ ছি ছি করে উঠল এই ক্যু এর বিরুদ্ধে কিন্তু মগের মুল্লুকে মগরা কি কারো কথা শোনে? তারা এই বিক্ষোভের সব দোষ তুলে দিল সিপিবির ঘাড়ে আর শুরু হলো ব্যাপক ধরপাকড়। হাজারে হাজারে বার্মিজরা থাইল্যান্ডের দিকে পালাতে লাগল আর দলে দলে বিভিন্ন আন্দারগ্রাউন্ড পার্টিতে যোগ দিতে লাগল।  এই ফাঁকে ১৯৮৯ সালে বার্মার নাম বদলে হয়ে গেল ‘মায়ানমার!’

পরের পর্বঃ
https://delhkhan.com/%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be-%e0%a6%b0%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97-%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%83-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae/

লেখা টি রোর বাংলায় প্রকাশিত
https://roar.media/bangla/main/history/rohingya-stories-2-independence-of-union-of-burma-and-the-civil-war/

Delwar Hossain Khan (Del H Khan)
দেলোয়ার হোসেন খান (ডেল এইচ খান)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *